যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের অবস্থানের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া নতুন ভিসা নীতি কার্যকর হওয়ার আগেই আটকে দিয়েছেন একটি ফেডারেল আদালত। একই সময়ে অভিবাসীদের স্থায়ী বসবাসের সুযোগ সীমিত করার আরেকটি প্রস্তাবিত নীতির বিরুদ্ধেও দেশটির একাধিক অঙ্গরাজ্য আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদেশি শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট সময়ের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সুযোগ সীমিত করার কথা ছিল। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার থেকে এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও তার এক দিন আগে সোমবার আদালতের আদেশে এটি স্থগিত হয়ে যায়।

২০২৫ সালের আগস্টে প্রস্তাব করা নীতিমালায় বলা হয়েছিল, এফ-১ শিক্ষার্থী ভিসাধারীরা সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে পারবেন। একইভাবে বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত থাকার সময়সীমা ২৪০ দিন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে আরও ২৪০ দিন অবস্থানের অনুমতির জন্য আবেদন করার সুযোগ রাখার কথা ছিল।

মার্কিন শ্রমিক ইউনিয়ন এবং উচ্চশিক্ষা-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর একটি জোট আদালতে আবেদন করার পর বোস্টনের ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক এফ. ডেনিস সেলর চতুর্থ ওই নীতির বাস্তবায়নে স্থগিতাদেশ দেন। নীতিটি কার্যকর হওয়ার ঠিক আগের দিনই এই আদেশ আসে।

বিচারক সেলর, যিনি সাবেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাঁর আদেশে বিদেশি শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের অবদানের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বিদ্যমান ভিসা ব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বিদেশি শিক্ষাবিদ যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন। নতুন বিধিনিষেধের ফলে উচ্চশিক্ষা খাতের পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতিতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রস্তাবিত নিয়ম কার্যকর হলে প্রায় ১৬ লাখ এফ-১ ভিসাধারী বিদেশি শিক্ষার্থী এর আওতায় পড়তেন। পাশাপাশি শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অধীনে থাকা প্রায় পাঁচ লাখ জে-১ ভিসাধারীও নতুন ব্যবস্থার প্রভাবের মুখে পড়তেন।

ট্রাম্প প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভিসা ব্যবস্থায় জালিয়াতি প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে নতুন নীতির পক্ষে যুক্তি দিয়েছিল। তবে বিচারক সেলর মনে করেন, এ ধরনের যুক্তি নীতিটি বাস্তবায়নের পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।

‘পাবলিক চার্জ’ নীতি নিয়েও আইনি লড়াই

বিদেশি শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ভিসা নীতির পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি অভিবাসন নীতিও আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ‘পাবলিক চার্জ’ নামে পরিচিত এই নীতির বিরুদ্ধে ২২টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসি কর্তৃপক্ষ মামলা করেছে।

ম্যানহাটানের একটি ফেডারেল আদালতেও সোমবার এ বিষয়ে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়মটি আগামী শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে ‘পাবলিক চার্জ’ বলতে সাধারণত এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি জীবনযাপনের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে সরকারি সুবিধা বা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গ্রিন কার্ড বা স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদনকারী কোনো ব্যক্তি ‘পাবলিক চার্জ’ হিসেবে বিবেচিত হলে তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ প্রশাসনের হাতে থাকবে।

বর্তমান ব্যবস্থায় সরকারি সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে একজন অভিবাসীকে কখন ‘পাবলিক চার্জ’ হিসেবে গণ্য করা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা রয়েছে। তবে নতুন প্রস্তাবে সেই স্পষ্ট নির্দেশনার কিছু অংশ বাদ দিয়ে অভিবাসন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

এর ফলে শুধু নগদ অর্থ সহায়তা নয়, বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুবিধা গ্রহণের বিষয়ও কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের আওতায় আসতে পারে। বিশেষ করে মেডিকেডের মতো স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সহায়তা এবং অন্যান্য সরকারি কর্মসূচি ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে স্থায়ী বসবাসের আবেদন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রস্তাবিত নিয়মের সমালোচকেরা আরও বলছেন, কোন ধরনের সরকারি সেবা গ্রহণ করলে একজন অভিবাসী ‘পাবলিক চার্জ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন, তা পরিবারগুলোর কাছে স্পষ্ট থাকবে না। এতে অনেক অভিবাসী প্রয়োজনীয় খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া থেকেও বিরত থাকতে পারেন।

নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ও ইলিনয়সহ ২২টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসি নতুন নীতির বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। এ ছাড়া ছয়টি শহর ও কাউন্টিও আলাদাভাবে একটি মামলা করে প্রস্তাবিত বিধানটির বিরোধিতা করেছে।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এক বিবৃতিতে বলেন, নতুন নীতির ফলে অভিবাসী পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি থেকে দূরে সরে যেতে পারে।

মামলাকারীদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের যোগ্যতা নির্ধারণের মূল আইনি ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করার চেষ্টা করছে, যা তাদের মতে প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রমের শামিল।

বাদীপক্ষ আরও যুক্তি দিয়েছে, খাদ্য, চিকিৎসা বা অন্যান্য বৈধ সরকারি সুবিধা গ্রহণের কারণে কোনো ব্যক্তির গ্রিন কার্ডের আবেদন বাতিল করা আইনসঙ্গত নয়। তাদের দাবি, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত নিয়ম বিদ্যমান মার্কিন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এর মাধ্যমে অভিবাসীদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version