ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, অর্থাৎ ডিআর কঙ্গোর বুকাভু শহরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের বড় একটি অংশ শিশু ও শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে। আগুনের ঘটনায় আরও অন্তত ২৯ জন আহত হয়েছেন, যাদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

দক্ষিণ কিভু প্রদেশের রাজধানী বুকাভুর চিমপুন্ডা এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তা দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আশপাশের আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

এএফসি-এম২৩ গোষ্ঠীর মুখপাত্র লরেন্স কানিউকার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ১৯ জন মেয়ে এবং পাঁচজন ছেলে রয়েছে। তবে নিহতদের সম্পূর্ণ পরিচয় ও বয়স সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৮টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ পরিচালিত সম্প্রচারমাধ্যম রেডিও ওকাপি। এরপর আগুন দ্রুত উজামা প্রাইমারি স্কুল ও ফুরাহা সেকেন্ডারি স্কুলের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে স্কুলের আশপাশের বসতিগুলোও আগুনের কবলে পড়ে।

আগুনের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে স্কুলের ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরা প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত বের হওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় প্রচণ্ড ধোঁয়ায় অনেক শিক্ষার্থী শ্বাস নিতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন শুধু দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আশপাশের বিপুল সংখ্যক কাঠের ঘরেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ কিভুর উপ-গভর্নর দুনিয়া মাসুমবুকো বুয়েঙ্গে জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৩০০টি কাঠের তৈরি বসতঘর ধ্বংস হয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় স্কুল থেকে বের হওয়ার সময়।

স্থানীয় কর্মকর্তা প্যাট্রিস বুদুগের বক্তব্য অনুযায়ী, আগুন থেকে বাঁচতে শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বের হওয়ার চেষ্টা করলে সেখানে প্রচণ্ড ভিড় ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এক পর্যায়ে অনেকে হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে যায়। কয়েকজন শিক্ষার্থী অন্যদের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারায় এবং অনেকে ঘটনাস্থলেই অচেতন হয়ে পড়ে।

অগ্নিকাণ্ডের পরপরই আহতদের উদ্ধারে স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকারী দল কাজ শুরু করে। গুরুতর আহতদের দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এএফসি-এম২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে ২১ জনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে ১৭ জন কাদুতু জেনারেল হাসপাতালে এবং আরও চারজন বুকাভু প্রাদেশিক জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

একটি স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রের নার্স ক্রিস্টোফ জিগাশানে জানিয়েছেন, আগুনের পর সেখানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে নিয়ে আসা হয়। প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী এবং কয়েকজন শিক্ষককে চিকিৎসার জন্য ওই ক্লিনিকে নেওয়া হয়েছিল।

চিকিৎসাকেন্দ্রে আসা বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর প্রধান সমস্যা ছিল ধোঁয়ার কারণে তীব্র শ্বাসকষ্ট। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে তাদের অনেকের শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হয়।

চিকিৎসাকর্মীদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। কেউ ঘটনাস্থলেই মারা যায়, আবার কয়েকজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাদের মৃত্যু হয়।

এই ঘটনায় পুরো বুকাভু শহরে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এত বড় অগ্নিকাণ্ডের কারণ কী এবং কেন আগুন এত দ্রুত দুটি স্কুল ও শত শত বসতিতে ছড়িয়ে পড়ল—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

বিশেষ করে কাঠের তৈরি ঘরগুলো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি ছিল বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

আর স্কুল চলাকালীন সময়ে আগুন লাগায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বের করে আনার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না, জরুরি বহির্গমন পথ কতটা কার্যকর ছিল এবং আগুন লাগার পর উদ্ধার কার্যক্রম কত দ্রুত শুরু হয়েছিল—এসব বিষয়ও এখন তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের অধিকাংশই শিশু হওয়ায় ঘটনাটি আরও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে স্থানীয় মানুষকে। একটি স্বাভাবিক স্কুল সকাল মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় ভয়াবহ আতঙ্কের ঘটনায়।

এখন আহতদের চিকিৎসা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করাই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে আগুনের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডিআর কঙ্গোর বুকাভুর এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড আবারও মনে করিয়ে দিল—স্কুল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেখানে বিপুলসংখ্যক শিশু একসঙ্গে অবস্থান করে, সেখানে সামান্য একটি দুর্ঘটনাও মুহূর্তের মধ্যে বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

এই ঘটনায় নিহত শিশু ও অন্যান্যদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version