২০৩০ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। মরক্কোর পক্ষ থেকে ফাইনালের সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে একটি বিশাল নতুন স্টেডিয়ামের নাম সামনে আনা হলেও বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা বলছে, এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

মরক্কোর রাজধানী কাসাব্লাঙ্কার কাছাকাছি বেনস্লিমান এলাকায় নির্মাণাধীন কিং হাসান টু স্টেডিয়ামকে ফাইনালের জন্য নিজেদের পছন্দের ভেন্যু হিসেবে তুলে ধরেছে দেশটির ফুটবল কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর স্প্যানিশ সংবাদ সংস্থা ইএফইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রয়্যাল মরোক্কান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফৌজি লেকজা জানান, বিশ্বকাপের ফাইনাল বেনস্লিমান শহরেই আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তার বক্তব্যে বিষয়টি অনেকটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মতোই উপস্থাপিত হয়।

কিন্তু মরক্কোর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি পরিষ্কার করে ফিফা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফাইনালের ভেন্যু নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ফিফার একজন মুখপাত্র ইএফইকে জানান, গত ৫ আগস্ট সংস্থাটি যে অবস্থান জানিয়েছিল, সেটিই এখনো কার্যকর রয়েছে। নির্দিষ্ট সময় এলে ফাইনালের ভেন্যু সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

অর্থাৎ মরক্কো তাদের পছন্দের স্টেডিয়ামের নাম প্রকাশ করলেও, ফিফার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি।

এখানেই শেষ নয়। ফাইনালের ভেন্যু নির্বাচনকে ঘিরে এরই মধ্যে রাজনৈতিক ও ক্রীড়া—দুই ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে।

এর আগে এমন একটি দাবিও সামনে এসেছিল যে, ২০২৬ সালের পরবর্তী ফিফা সভাপতি নির্বাচনে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে সমর্থনের বিনিময়ে মরক্কো বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের সুযোগ পেতে পারে। তবে ফিফা গত ৫ আগস্ট এই ধরনের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

অন্যদিকে মরক্কোর প্রস্তাবিত কিং হাসান টু স্টেডিয়ামের সক্ষমতা তাদের দাবিকে শক্তিশালী করার মতোই বড়।

বেনস্লিমান এলাকায় নির্মাণাধীন এই স্টেডিয়ামে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শকের আসন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এই সক্ষমতা পূর্ণ হলে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফুটবল স্টেডিয়ামে পরিণত হতে পারে। আর এত বড় ধারণক্ষমতার কারণে বিশ্বকাপের ফাইনালের জন্য স্টেডিয়ামটি মরক্কোর একটি শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে স্পেনও পিছিয়ে নেই।

বার্সেলোনার ঐতিহাসিক ক্যাম্প ন্যু সংস্কারের পর প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার দর্শক ধারণ করতে পারবে বলে পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ফাইনাল আয়োজনের ক্ষেত্রে স্পেনের হাতেও রয়েছে একটি অত্যন্ত বড় ও ঐতিহ্যবাহী ভেন্যু।

মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যুও স্পেনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। বর্তমানে স্টেডিয়ামটির ধারণক্ষমতা প্রায় ৭৮ হাজার ২৯৭ জন।

স্পেনের ফুটবল কর্তৃপক্ষও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ফাইনাল আয়োজনের বিষয়ে তাদের আগ্রহ কম নয়।

চলতি সপ্তাহে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি রাফায়েল লুয়ান বলেন, বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাবে অংশ নেওয়া দেশগুলো যে শর্তে সম্মত হয়েছিল, সেখানে ফাইনালের ভেন্যু নিয়ে যথেষ্ট স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন ছিল।

তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল—পুরুষ ও নারী উভয় ফুটবলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্পেনের ঐতিহ্য এবং সক্ষমতা বিবেচনায় ফাইনাল আয়োজনের দাবি তাদেরও রয়েছে।

ফলে এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, ফাইনালের জন্য শেষ পর্যন্ত কোন দেশকে বেছে নেবে ফিফা?

২০৩০ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর নাম নির্ধারিত হয়েছিল প্রায় তিন বছর আগে। সে সময় এই যৌথ আয়োজনকে ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার একটি প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

কিন্তু ফাইনালের ভেন্যু নিয়ে প্রতিযোগিতা সেই ঐক্যের ছবিতে কিছুটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

কারণ স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে শুধু ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নেই; দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অতীতে বিভিন্ন সময়ে টানাপোড়েন দেখা গেছে।

বিশেষ করে সীমান্ত ও ভূখণ্ডসংক্রান্ত কিছু বিষয় দুই দেশের সম্পর্কে সংবেদনশীল হয়ে আছে। স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতাকে ঘিরেও দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সীমান্ত উত্তেজনা রয়েছে।

অতীতে সেউতা সীমান্তে বড় ধরনের মানবিক সংকটও তৈরি হয়েছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সীমান্ত পারাপারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

তাই ২০৩০ বিশ্বকাপ নিছক একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কূটনীতি, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া রাজনীতির নানা বিষয়।

তবে বিশ্বকাপের মূল আয়োজক তিন দেশ হলেও টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী পর্বে থাকবে আরও তিনটি দেশ।

বিশ্বকাপের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে একটি করে ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল উরুগুয়েতে এবং ঐ আসরের সব ম্যাচই হয়েছিল দেশটির রাজধানী মন্টেভিডিওতে।

অর্থাৎ ২০৩০ বিশ্বকাপ হবে একই সঙ্গে ঐতিহ্য ও আধুনিক আয়োজনের এক অনন্য সংমিশ্রণ।

কিন্তু সেই আসরের সবচেয়ে বড় ম্যাচ—বিশ্বকাপ ফাইনাল—ঠিক কোথায় হবে, সেটিই এখনো অমীমাংসিত।

মরক্কো ইতোমধ্যে তাদের পছন্দের স্টেডিয়ামের নাম সামনে এনেছে। স্পেনও নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক ভেন্যুগুলো নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।

ফিফা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ফাইনালের ভেন্যুর নাম ঘোষণা করবে, তখনই স্পেন-মরক্কোর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার শেষ অধ্যায় লেখা হবে।

আর সেই সিদ্ধান্ত শুধু একটি স্টেডিয়াম বেছে নেওয়ার বিষয় হবে না—এটি ২০৩০ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ক্রীড়া ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version