মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। বৃহস্পতিবার সকালেও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত এবং তেলবাহী জাহাজে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়ায় দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
জুলাইয়ের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যতম মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ১০০ ডলার অতিক্রম করল। দিনের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৪ ডলারে পৌঁছায়। আগের দিন বুধবার এর দাম প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কয়েক মাস ধরে এ পথ দিয়ে তেল পরিবহন তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকায় বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। এমনকি জুনে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পরও জাহাজ চলাচল পুরোপুরি ব্যাহত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরুতে পারস্য উপসাগর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৮ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ হতো। মাসের শেষ দিকে তা বেড়ে ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছায়। কিন্তু নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক তেল পরিবহন ২০ লাখ ব্যারেলেরও নিচে নেমে এসেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির হিসাব বলছে। সাত দিনের গড় সরবরাহও কমে প্রায় ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য বলছে, ২ সেপ্টেম্বরের পর থেকে কোনো অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেনি।
এদিকে চলতি সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, পারস্য উপসাগরে পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করা হয়েছে। পাল্টা হিসেবে ইরান জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
যদিও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ বিকল্প রুট ব্যবহার করে রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত পাইপলাইনের মাধ্যমে ফুজাইরাহ বন্দরে তেল পাঠাচ্ছে। ইরাক তুরস্ক হয়ে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে সরবরাহ করছে। সৌদি আরবও ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করে ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহন অব্যাহত রেখেছে।
তবে এসব বিকল্প পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর হামলা এবং বিভিন্ন তেল অবকাঠামোর ওপর আক্রমণের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দামের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ মজুত তেল ব্যবহার করলেও সেই মজুত সীমিত। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে দৈনিক প্রায় ৮৩ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বন্ধ ছিল এবং একই সময়ে বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।
বছরের শেষ প্রান্তিকে বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে সরবরাহ সংকটের সঙ্গে চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হলে বাজারে আরও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, বিশ্ববাজারে এখনো পর্যাপ্ত মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। তাই উত্তেজনা কমার ইঙ্গিত মিললেই তেলের দামে সংশোধন আসতে পারে। তবে সাম্প্রতিক প্রবণতা বলছে, দাম কমলেও তা আগের তুলনায় ধীরগতিতে কমছে।
বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের পাশাপাশি মারাবান ক্রুড, ডিএমই ওমান বেঞ্চমার্ক এবং ওপেকের গড় তেলের দামও ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের মূল্যও একই সীমা অতিক্রম করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরু না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে এবং তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
