ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া কয়েকটি মৃত্যুদণ্ড নিয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, পর্যাপ্ত ও ন্যূনতম প্রমাণ ছাড়া কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত।

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের বিচারকের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো ন্যূনতম প্রমাণও পাওয়া যায়নি। এরপরও তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।

হাইকোর্টের মতে, এমন সিদ্ধান্তের কারণে সংশ্লিষ্ট আসামিদের দীর্ঘ সময় কনডেম সেলে থাকতে হয়েছে। এর ফলে শুধু আসামিদের ওপর নয়, তাদের পরিবারের ওপরও গুরুতর ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়েছে।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ উঠে আসে।

‘সভ্য সমাজে এমন সাজা প্রত্যাশিত নয়’

পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেন, একটি সভ্য সমাজে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন সাজা প্রত্যাশা করা যায় না। আদালতের পর্যবেক্ষণে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট বিচারকের সংবেদনশীলতার ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

হাইকোর্ট মনে করেন, দণ্ডবিধি এবং সাজা প্রদানের সঙ্গে সম্পর্কিত মৌলিক বিধানগুলো যথাযথভাবে আয়ত্ত না করা পর্যন্ত ওই বিচারককে দায়রা আদালতের বিচারিক দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা শ্রেয়।

নুসরাত হত্যা মামলার পেছনের ঘটনা

রায়ে বলা হয়েছে, নুসরাতকে হত্যার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার নির্দেশ বাস্তবায়নে শাহাদাত হোসেন শামীম ও নুরউদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীর ভূমিকা পালন করেন বলে আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

আদালত আরও জানিয়েছে, মামলা প্রত্যাহারে নুসরাত রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যার জন্য শামীম, নুরউদ্দিন, জাবেদ ও জুবায়েরকে প্ররোচিত করেছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা।

নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দি গুরুত্বপূর্ণ

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দিকে ‘ত্রুটিহীন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত মনে করেন, এই জবানবন্দি মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য এবং গ্রহণযোগ্যতার প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করেছে।

ওই জবানবন্দিতে চার ব্যক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে এসেছে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া দণ্ডিত আসামিদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও আদালত সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বলে বিবেচনা করেছে।

রায়ে বলা হয়েছে, রিমান্ডে আসামিদের নির্যাতন করা হয়েছিল—এমন কোনো প্রমাণ মামলার নথিতে পাওয়া যায়নি। শুধু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল বলেই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অবিশ্বাস্য হয়ে যায় না বলেও মত দিয়েছেন আদালত।

১০ আসামি খালাস

এর আগে গত ২৪ আগস্ট নুসরাত হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ের ওপর সিদ্ধান্ত দেন হাইকোর্ট।

মূল হোতা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়।

তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরও ১০ আসামির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় তাদের খালাস দেওয়া হয়।

এ ছাড়া আরও চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন—নুরউদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ এবং উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন।

আদালতের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

নুসরাত হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতকে অবশ্যই পর্যাপ্ত, নির্ভরযোগ্য ও আইনসম্মত প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেই তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যায় না। বিচারিক সিদ্ধান্তে প্রমাণের মান, সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version