নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিখোঁজ কর্মীদের উদ্ধারে বিশেষ সমন্বয়কেন্দ্র বা ‘ওয়ার রুম’ চালু করেছে অস্ট্রিয়ার জলবিদ্যুৎ সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যান্ড্রিটজ। কোম্পানিটির প্রায় ১৫০ জন ভারতীয় ও নেপালি কর্মীর এখনও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কাঠমান্ডুর একটি হোটেলের নিচতলার একটি কক্ষে বসে উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা করছেন কোম্পানির ১০ সদস্যের একটি দল। তাদের সামনে রয়েছে বিভিন্ন মানচিত্র। দেয়ালে বড় করে প্রদর্শন করা হচ্ছে আপার ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও আশপাশের এলাকার মানচিত্র। নিখোঁজ কর্মীদের সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যয়

গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে প্রবল বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এতে দেশটির একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত ১৫টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় ৬৩৯ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

আপার ত্রিশুলি-১ প্রকল্পটি কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। তিব্বত সীমান্ত থেকেও প্রকল্পটির দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্ব দিকে। ২১৬ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার এই প্রকল্পটি ভোতে কোশি নদী করিডরের অন্যতম বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে গড়ে ওঠার কথা ছিল।

প্রকল্পটিতে সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপনের দায়িত্বে ছিল অ্যান্ড্রিটজ।

সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ে উদ্ধার অভিযান

অ্যান্ড্রিটজের নেপাল শাখার প্রধান মায়াঙ্ক টোমার জানান, দুর্যোগের পরপরই নিখোঁজ কর্মীদের খোঁজ এবং উদ্ধার কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য ‘ওয়ার রুম’ চালু করা হয়। নেপালি সেনাবাহিনীর পাশাপাশি কোম্পানির নিজস্ব দলও উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছে।

কোম্পানির পক্ষ থেকে নিখোঁজ কর্মীদের সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে পাওয়া তথ্য নেপাল সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে দুর্গত এলাকায় আটকে পড়া কর্মীদের কাছে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে খাবার পৌঁছানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল।

সোমবার হেলিকপ্টারে করে ঘটনাস্থলে সরাসরি অনুসন্ধানের অনুমতি পাওয়া গেলেও খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেই অভিযান শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে হয়।

দুর্গম এলাকায় স্থল ও আকাশপথে অনুসন্ধান

আবহাওয়া পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে চারজনকে হেলিকপ্টারে এবং আরও আটজনকে দুটি চার চাকার গাড়িতে করে দুর্গত এলাকায় পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

উদ্ধারকারীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাড়ি যতদূর পর্যন্ত যেতে পারবে, সেখান থেকেই শুরু হবে পায়ে হেঁটে অনুসন্ধান। নিখোঁজদের জীবিত বা মৃত—যে অবস্থাতেই হোক, যত বেশি মানুষকে সম্ভব খুঁজে বের করাই তাদের লক্ষ্য।

তবে অভিযানের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, কাদা এবং ধ্বংসস্তূপ। কোম্পানির কর্মকর্তাদের ধারণা, নদীর পাশে থাকা তাদের ক্যাম্পটি বন্যার পর সম্পূর্ণভাবে কাদার নিচে চাপা পড়ে গেছে। ফলে কেউ নদীর তলদেশে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কয়েকজন কর্মী আবার সুড়ঙ্গের ভেতরেও অবস্থান করতে পারেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রযুক্তিগত সমস্যাও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে

উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সময় যোগাযোগ ও তথ্য সংগ্রহেও সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে দলটিকে। যে হোটেলে ‘ওয়ার রুম’ স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে ইন্টারনেট সংযোগ ঠিকমতো কাজ করছিল না। মোবাইল নেটওয়ার্কও ছিল দুর্বল।

এ ছাড়া দুর্গত এলাকার সর্বশেষ স্যাটেলাইট বা গুগল আর্থের ছবি সংগ্রহের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ছবি পাওয়া যায়নি।

কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নিখোঁজ কর্মীদের অবস্থান ছড়িয়ে থাকতে পারে। এর মধ্যে পাঁচটি স্থানকে সম্ভাব্য অনুসন্ধান এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কর্মীদের ক্যাম্প এবং বিভিন্ন সুড়ঙ্গের প্রবেশপথকে।

সময় বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে উদ্বেগ

উদ্ধার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলার একপর্যায়ে দলের একজন সদস্য জানতে চান, নিখোঁজদের কাউকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া সম্ভব হবে কি না। উত্তরে সময়ের বিষয়টি তুলে ধরে একজন জানান, মঙ্গলবার দুর্যোগের এক সপ্তাহ পূর্ণ হতে যাচ্ছে।

সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ ততই বাড়ছে। তারপরও অভিযান থেকে সরে আসতে নারাজ উদ্ধারকারী দল। প্রতিকূল পরিবেশ ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিখোঁজ সহকর্মীদের খুঁজে বের করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version