লেবানন ও গাজাসহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযান বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতায় যেতে ইরান আগ্রহী নয় বলে জানিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে লেবাননের আল-মানার টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো তেহরান খুব গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে লেবাননের রাজধানী বৈরুত এবং দক্ষিণাঞ্চলের দাহিয়েহ এলাকায় ইসরাইলি সামরিক তৎপরতার দিকে ইরানের নজর রয়েছে।

রেজায়ির বক্তব্য অনুযায়ী, বৈরুত ও দাহিয়েহকে ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব অঞ্চলের দিকে কোনো পক্ষের অগ্রসর হওয়ার সুযোগ নেই।

ফার্স নিউজ ও তাবনাকের প্রতিবেদনের বরাতে তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তার দাবি, নেতানিয়াহুর নেওয়া কিছু পদক্ষেপ ইসরাইলের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সংকট তৈরি করছে। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়ায় রূপ নিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

লেবানন, গাজা ও সিরিয়া নিয়ে ইরানের অবস্থান

মোহসেন রেজায়ি বলেন, ইরানের কাছে লেবাননের নিরাপত্তা পুরো পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই লেবানন ও গাজায় চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ করার পাশাপাশি সিরিয়ায় ইসরাইলি হামলাও বন্ধ করতে হবে।

এ ছাড়া লেবাননের যেসব ভূখণ্ড ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখান থেকেও ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো সমঝোতার ক্ষেত্রে যুদ্ধ বন্ধকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে তেহরান। ইরানি এই কর্মকর্তা বলেন, পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি আলাদা নয়; বরং একটির সঙ্গে আরেকটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

নতুন সংঘাত হলে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি

রেজায়ি বলেন, ইরান যুদ্ধ চায় না। তবে সংঘাত শুরু হলে মোকাবিলার জন্য দেশটি প্রস্তুত রয়েছে। ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধ শুরু হলে আগের সংঘাতের মতো পরিস্থিতি থাকবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালালে বা কোনো দেশ থেকে মার্কিন যুদ্ধবিমান পরিচালিত হয়ে ইরানে হামলা চালালে সেই দেশগুলোও সম্ভাব্য শত্রু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশেষ করে বৈরুত ও দাহিয়েহকে ইরানের ‘রেড লাইন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব এলাকায় নতুন কোনো আগ্রাসন হলে ইরানের প্রতিক্রিয়া আগের তুলনায় ভিন্ন ও আরও কঠোর হতে পারে।

হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের প্রশংসা

সাক্ষাৎকারে লেবাননের বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অঞ্চলের মানুষের প্রতি শুভেচ্ছা জানান রেজায়ি। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর নিহত সদস্যদের স্মরণ করেন তিনি।

সংগঠনটির কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার নিহত হওয়ার পর শেখ নাঈম কাসেম যেভাবে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন, তারও প্রশংসা করেন রেজায়ি। লেবাননের রাজনৈতিক ও জাতীয় পর্যায়ে ভূমিকা রাখার জন্য দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরির প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যোগাযোগে অচলাবস্থা

সর্বশেষ বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর পর তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। পরবর্তী সময়ে অঞ্চলটির বিভিন্ন মার্কিন ও ইসরাইলি স্থাপনায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর আসে।

সংঘাত থামাতে ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইসলামাবাদে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা ওই সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ তোলে তেহরান।

এর পর থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান। তেহরানের বক্তব্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান ও বৈরী অবস্থান থেকে সরে না আসা পর্যন্ত নতুন করে সংলাপ শুরু করার পরিবেশ তৈরি হবে না।

ফলে লেবানন, গাজা ও সিরিয়ার পরিস্থিতি শুধু আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয় নয়; যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রেও এসব ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version