মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা স্থাপনা ও নজরদারি অবকাঠামোর ওপর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় সিআইএসহ বিভিন্ন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার স্থাপনা, রাডার এবং তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা অবকাঠামোর জন্য এ ঘটনাকে অত্যন্ত বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কিছু স্থাপনা মার্কিন সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথভাবে ব্যবহার করত। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং ধ্বংস হওয়া প্রযুক্তি দ্রুত প্রতিস্থাপনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রিয়াদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষতির দাবি

মার্কিন ও উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে থাকা একটি সিআইএ স্টেশন এবং পূর্ব ইরাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা কেন্দ্র রয়েছে।

এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মোতায়েন করা মার্কিন রাডার ও নজরদারি ব্যবস্থাও হামলার শিকার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তি মূলত আকাশপথ পর্যবেক্ষণ, ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ এবং সামরিক তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত হয়।

স্যাটেলাইট ছবি ও অন্যান্য দৃশ্যমান তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েকটি উন্নত রাডার ব্যবস্থার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে জর্ডানে থাকা একটি AN/TPY-2 রাডার এবং কাতারে মোতায়েন একটি AN/FPS-12 ফেজড-অ্যারে রাডারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও সৌদি আরবে থাকা কয়েকটি মার্কিন কৌশলগত স্থাপনাও হামলার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

একসঙ্গে বিভিন্ন সামরিক ও গোয়েন্দা স্থাপনায় হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সম্পদ রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চলতে থাকলে বিপুলসংখ্যক ঘাঁটি, রাডার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো একই সঙ্গে সুরক্ষিত রাখা কতটা সম্ভব—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শুধু স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতিই নয়, আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বা সিএসআইএসের একটি প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ও THAAD প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, কয়েক মাসের সংঘাতে বিপুলসংখ্যক প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে একই মাত্রার হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত নতুন করে মজুত গড়ে তুলতে হতে পারে।

সংঘাতের পেছনে দীর্ঘ উত্তেজনা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের প্রভাবও এ অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনার নিরাপত্তার ওপর পড়েছে।

ইরানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। পাল্টা যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের সেনা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষা জোরদার করেছে।

তবে গোয়েন্দা স্থাপনা, রাডার এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যের সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব দাবির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও পরবর্তী যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত শুধু সরাসরি সামরিক লড়াইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, রাডার নেটওয়ার্ক, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version