ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক সংঘাতের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ইরানকে পরাজিত করার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি চাইলেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করে দিতে পারেন?
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য বলছে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। বরং বাস্তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে রয়েছে সাংবিধানিক, আন্তর্জাতিক এবং সামরিক—তিন ধরনের বড় বাধা।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়।
যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস পরিবহনের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এই সরু জলপথের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে হরমুজে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।
এই কারণেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের দাবি কী?
নিউইয়র্কে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতে জয় পাওয়ার পর হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা হবে।
তিনি এমন কথাও বলেছেন যে, সেখানে মার্কিন নৌ অবরোধ কার্যকর রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া জাহাজ চলাচলের সুযোগ থাকবে না।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পরই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই হরমুজকে নিজেদের ভূখণ্ড ঘোষণা করতে পারবে?
ইরানের প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।
ইরানের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, কোনো রাজনৈতিক ঘোষণা, প্রেসিডেন্টের আদেশ কিংবা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলেই হরমুজ প্রণালির মালিকানা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি দাবি করেছেন, হরমুজ ইরানের ছিল, আছে এবং থাকবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রণালিতে কী ধরনের জাহাজ চলাচল করবে এবং কখন এর প্রবেশপথ বন্ধ বা খোলা থাকবে—এ বিষয়ে ইরানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে হরমুজের পুরো জলপথ যে শুধু ইরানের মালিকানাধীন—আন্তর্জাতিক আইনও এমন সরল দাবি সমর্থন করে না।
হরমুজ আসলে কার অধীনে?
হরমুজ প্রণালির এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান। অর্থাৎ এই জলপথের ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে দুই দেশেরই সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
সমুদ্র আইন অনুযায়ী, উপকূলীয় রাষ্ট্র সাধারণভাবে নিজেদের উপকূল থেকে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আঞ্চলিক জলসীমার অধিকার ভোগ করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক নৌপথের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের জাহাজ চলাচলের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
হরমুজের সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল। ফলে দুই পাশের আঞ্চলিক জলসীমা একে অপরের কাছাকাছি চলে আসে এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এখানেই আসে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন বা UNCLOS আন্তর্জাতিক জলপথ ও সমুদ্রসীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম নির্ধারণ করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেউই এই কনভেনশন আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেনি, এর বহু নীতি আন্তর্জাতিক রীতিনীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুধু ঘোষণা দিয়ে কি ভূখণ্ড দখল করা যায়?
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, না।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে কোনো নতুন ভূখণ্ডকে দেশের অংশ বানিয়ে দিতে পারেন না। কোনো ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করতে হলে নির্দিষ্ট সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
অতীতে লুইজিয়ানা, হাওয়াই কিংবা অন্যান্য ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তি, কংগ্রেসের অনুমোদন অথবা নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ট্রাম্প যদি হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ঘোষণা করেও দেন, শুধু সেই ঘোষণার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে হরমুজ মার্কিন ভূখণ্ডে পরিণত হবে না।
আর সামরিক শক্তি ব্যবহার করে যদি যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ দখলের চেষ্টা করে, তাহলে সেটি আরও বড় আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
কারণ অন্য একটি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড বা সমুদ্রসীমার ওপর জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।
বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও কি মালিকানা পাওয়া যাবে?
এখানেও বিষয়টি জটিল।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, কোনো অঞ্চলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে বাস্তব নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সামরিকভাবে কোনো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া আর বৈধভাবে সেই অঞ্চলকে নিজের রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি দিয়ে হরমুজের কোনো অংশ নিয়ন্ত্রণে নিলেও সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ মার্কিন ভূখণ্ড হয়ে যাবে না।
বরং এমন পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত আরও বাড়াতে পারে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিরোধিতা তৈরি হতে পারে।
ইরান ও ওমানের আলোচনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানই গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রণালির অপর তীরের দেশ ওমানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং সংঘাত কমানোর বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ পুরোপুরি স্বাভাবিক করার বিষয়টি আলাদা একটি প্রশ্ন। ইরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে।
এর মধ্যে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয় রয়েছে।
অর্থাৎ হরমুজকে কেন্দ্র করে এখন শুধু সামরিক শক্তির লড়াই নয়, কূটনৈতিক দরকষাকষিও চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও চাপ বাড়ছে
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও দেখা যাচ্ছে।
বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ এই যুদ্ধের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। একই সময়ে দীর্ঘ সংঘাতের কারণে সামরিক সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
এর পাশাপাশি জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রভাবও পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও যুদ্ধের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন।
তাহলে ট্রাম্পের বক্তব্যের আসল অর্থ কী?
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রায়ই শক্তিশালী ও নাটকীয় ভাষা ব্যবহৃত হয়। তাই তাঁর প্রতিটি বক্তব্যকে সরাসরি বাস্তব নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার আগে এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ধারণা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন।
কারণ এর সঙ্গে শুধু সামরিক শক্তি নয়, জড়িত রয়েছে ইরানের সার্বভৌমত্ব, ওমানের ভূমিকা, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন, মার্কিন সংবিধান এবং বৈশ্বিক কূটনীতি।
সবশেষে বলা যায়, ট্রাম্প চাইলেই প্রেসিডেন্টের একটি ঘোষণার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বানিয়ে ফেলতে পারবেন না।
এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অবস্থান বিবেচনা করতে হবে।
আর সামরিক শক্তি দিয়ে হরমুজ দখলের চেষ্টা করলে সেটি শুধু ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়াবে না—পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
তাই ট্রাম্পের ঘোষণা যতটা চমকপ্রদ, বাস্তবে সেটিকে কার্যকর করা ততটাই কঠিন।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে এখন মূল প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র কি সামরিক চাপ বাড়াবে, নাকি শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার পথেই ফিরবে?
সেটিই আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন।

