শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—এমন দাবি করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ট্রিবিউন’। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ না হলে ভারত সফর এবং ব্রিকসের সংশ্লিষ্ট আয়োজনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা অনাগ্রহ দেখাতে পারে।
প্রতিবেদনটি কয়েকটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, গত ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
প্রায় ৪৫ মিনিটের ওই আলোচনায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টিকে সম্ভাব্য ভারত সফরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি দুই দেশের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর এবং প্রত্যর্পণ ইস্যুকে পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হিসেবে দেখানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। একই সময়ে ব্রিকসের একটি বিশেষ আয়োজনে অংশ নেওয়ার জন্যও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
ব্রিকসের আমন্ত্রণ নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিকসের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের আমন্ত্রণটি মূলত বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বকে এ ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজনে আমন্ত্রণ জানানোর প্রচলিত রীতির অংশ হিসেবেই এটি দেওয়া হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের আমন্ত্রণ এবং ব্রিকসের বিশেষ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণকে একই ধরনের বিষয় হিসেবে দেখছে না দিল্লি—এমন ইঙ্গিতও প্রতিবেদনে রয়েছে।
ঢাকায় ‘র’-প্রধানের সফর
১০ আগস্ট ঢাকায় আসেন ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামসুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ওই আলোচনাতেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং ঢাকার নতুন অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে।
একই দিনে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠক শেষে তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক ও গঠনমূলক পথে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভারতের আগ্রহের কথা জানান।
তিনি আরও বলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের অপেক্ষায় রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো সমস্যা নেই, যার সমাধানের পথ বের করা সম্ভব নয়।
দিল্লির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ?
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকের পর ঢাকার পরিবর্তিত অবস্থান সম্পর্কে দিল্লিকে অবহিত করা হয়েছে।
ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহী এবং পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তারেক রহমান সরকারের তুলনামূলক কঠোর অবস্থানকে দিল্লির কাছে কিছুটা অপ্রত্যাশিত হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে দুই দেশই নিজেদের অবস্থান থেকে কিছুটা নমনীয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারত—উভয়েই একে অপরের কৌশলগত গুরুত্ব উপলব্ধি করছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।
এ কারণে তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরসহ বাংলাদেশের অন্যান্য কূটনৈতিক তৎপরতার দিকেও দিল্লি নজর রাখছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে দিল্লির অবস্থান
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের অবস্থানও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হওয়ায় দিল্লির সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টিও আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
তাই শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের অবস্থান দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
তবে গত ৫ আগস্ট ভারত থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাটি ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় নতুন জটিলতা তৈরি করেছে বলেও প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের নিরাপত্তা দিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভারতের জন্য একটি স্থিতিশীল ও সহযোগিতামূলক বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমঝোতার কোনো পথ বের হয় কি না, তার ওপর দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।
তবে তারেক রহমান সত্যিই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে ভারত সফরের পূর্বশর্ত করেছেন কি না—এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি আপাতত ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কূটনৈতিক সূত্রভিত্তিক দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
