ভারত সফরে যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে সম্ভাব্য এই সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লিতে প্রস্তুতিমূলক তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
শুক্রবার ১৪ আগস্ট বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে, তবে সফরের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঠিক করা হয়নি।
সফরটি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। সম্ভাব্য দুই দিনের সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
দুই নেতার বৈঠক হলে সেখানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। বাণিজ্য ও যোগাযোগের পাশাপাশি জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোও আলোচনার টেবিলে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রথমবার মুখোমুখি বৈঠকের সম্ভাবনা
তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য বৈঠককে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা। কারণ, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান নেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কিছু জটিলতা তৈরি হয়। এরপর বাংলাদেশে নতুন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে।
এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এপ্রিলে নয়াদিল্লি সফর করেন এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন।
পরবর্তীতে ১০ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু
তারেক-মোদি বৈঠক হলে সবচেয়ে সংবেদনশীল আলোচনার একটি হতে পারে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ছাড়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধও জানিয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের অনুরোধ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার আওতায় পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
এর মধ্যে ভারত থেকে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে আবারও উত্তেজনা দেখা দেয়। বাংলাদেশ এ বিষয়ে ভারতের অবস্থানের সমালোচনা করলেও নয়াদিল্লি জানিয়েছে, ওই আয়োজনের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
পানি, বাণিজ্য ও সীমান্ত নিয়েও আলোচনা হতে পারে
শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়, দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলোও সম্ভাব্য বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে।
বাণিজ্য ভারসাম্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
এর পাশাপাশি নদীর পানি বণ্টনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে চুক্তির ভবিষ্যৎ এবং এর নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নয়াদিল্লি। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনেও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। তাই সফরটি ঠিক কবে এবং কী কর্মসূচিতে হবে, সে বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সরকারি সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
সম্ভাব্য এই সফর বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরই হবে না, বরং নতুন সরকারের অধীনে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক কোন পথে এগোতে যাচ্ছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।
