মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠাৎ উড়োজাহাজ পরিবর্তনের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ চমক তৈরি করেছিল। নিরাপত্তা, বিভ্রান্তি সৃষ্টি কিংবা প্রেসিডেন্টের গতিবিধি আড়াল—যে কারণেই এই কৌশল নেওয়া হয়ে থাকুক, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের গোপনীয়তার কৌশলের তুলনায় এটিকে খুবই সাধারণ ঘটনা বলছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা।

পুতিনের চলাচল ও বৈঠকের সময়সূচি নিয়ে রাশিয়ায় এতটাই কড়াকড়ি রয়েছে যে, কখনো কখনো তাঁর অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতে ভিডিও ফুটেজের পেছনের ছোটখাটো বিষয়ও বিশ্লেষণ করতে হয়। চলতি বছর কয়েকজন সাংবাদিক এমনকি বৈঠকের ভিডিওতে থাকা গাছপালার অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করেছেন। কোনো ফুটেজে পাতাগুলো শুকনো, আবার অন্য ফুটেজে একই জায়গার গাছপালা সতেজ দেখা যাওয়ায় তারা ধারণা করেন, ভিডিওগুলো একই দিনে ধারণ করা হয়নি।

অর্থাৎ ক্রেমলিন কোনো বৈঠকের যে তারিখ প্রকাশ করছে, বাস্তবে সেটি তার আগেও অনুষ্ঠিত হতে পারে। পরে নির্দিষ্ট সময়ে সেই বৈঠকের ভিডিও বা ছবি প্রকাশ করা হয়।

রাশিয়ার অনুসন্ধানী সাংবাদিক মিখাইল রুবিনের মতে, ট্রাম্পের বিমান পরিবর্তনের কৌশল পুতিনের ব্যবহৃত পদ্ধতির তুলনায় অনেকটাই সরল। পুতিনের গোপনীয়তার ধরনকে তিনি প্রায় দৈনন্দিন বিষয় হিসেবেই দেখেন।

পুতিনের অবস্থান গোপন রাখার আরেকটি কৌশল হলো একই ধরনের অফিস তৈরি করে রাখা। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের দাবি, রুশ প্রেসিডেন্টের একাধিক বাসভবনে প্রায় একই রকম দেখতে অফিস রয়েছে। ফলে কোনো বৈঠকের ভিডিও প্রকাশ পেলেও সেটি ঠিক কোন ভবনে হয়েছে, তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

শুধু অফিস নয়, পুতিনের যাতায়াতের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও স্যাটেলাইট ছবিতে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর বাসভবনের কাছাকাছি বিশেষ রেল অবকাঠামোর অস্তিত্বের কথা উঠে এসেছে। এমনকি কয়েকটি স্থানে প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য আলাদা স্টেশনের ব্যবস্থাও থাকার দাবি করা হয়েছে।

পুতিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদেরও কাজ করতে হয়। অনেক বৈঠকের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয় না। কখনো বৈঠক হওয়ার কয়েক দিন পর তার ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়। তখন প্রকাশিত তথ্য দেখে মনে হতে পারে, বৈঠকটি যেন সেদিনই অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ক্রেমলিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে কাজ করা নির্বাসিত সাংবাদিক ফারিদা রুস্তামোভার লেখাতেও এমন কয়েকটি উদাহরণের কথা উঠে এসেছে। তাঁর মতে, প্রকাশিত ভিডিও ও ছবির বিভিন্ন সূক্ষ্ম বিষয় বিশ্লেষণ করলে কখনো কখনো বোঝা যায়, সেগুলো আগের কোনো সময়ের বৈঠকের দৃশ্য।

ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের পোশাক, চুলের ধরন কিংবা আলো-আবহাওয়ার পার্থক্যও সাংবাদিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। রাশিয়ার সাংবাদিকদের মধ্যে আগেই ধারণ করা কোনো বৈঠকের ছবি বা ভিডিও পরে প্রকাশ করার জন্য একটি বিশেষ শব্দও প্রচলিত হয়েছে—‘কনসার্ভি’। শব্দটির অর্থ সংরক্ষিত খাবার বা কৌটাজাত খাবার।

তবে পুতিনের অবস্থান নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে ক্রেমলিন। এ বিষয়ে নতুন মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

পুতিনের গোপন চলাচলের বিষয়টি নতুন নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের সাবেক মস্কো ব্যুরো প্রধান আন্তন ট্রয়ানোফস্কি ২০১১ সালে রুশ প্রেসিডেন্টের গ্রামীণ বাসভবন লেক ভালদাই এলাকায় গিয়ে এমন একটি রেল অবকাঠামোর বিষয়ে জানতে পারেন, যা স্থানীয়দের কাছেও রহস্যজনক ছিল। পরবর্তীতে স্যাটেলাইট ছবিতে সেখানে একটি নতুন স্টেশন এবং হেলিপ্যাডের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়।

২০২৩ সালে রাশিয়ার ফেডারেল প্রটেকশন সার্ভিসের সাবেক এক কর্মকর্তা দাবি করেন, নজরদারি বা ট্র্যাকিং এড়ানোর জন্য পুতিন বিশেষ ট্রেন ব্যবহার করেন। ফাঁস হওয়া কিছু নথিতেও প্রেসিডেন্টের জন্য আলাদা ট্রেন থাকার কথা উঠে এসেছে। বাইরে থেকে সেটিকে সাধারণ যাত্রীবাহী ট্রেনের মতো মনে হলেও ভেতরে প্রেসিডেন্টের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ সুবিধা থাকার দাবি করা হয়।

করোনা মহামারির সময় পুতিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর হয়ে ওঠে। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ইচ্ছুক কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় কোয়ারেন্টিনে থাকার নিয়ম চালু করা হয়েছিল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর তাঁর নিরাপত্তা ঘিরে সতর্কতা আরও বাড়ানো হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই গোপনীয়তার পেছনে শুধু নিরাপত্তার বিষয়টি কাজ করে না। তাঁর অবস্থান ও কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করাও এক ধরনের কৌশল হতে পারে। এতে প্রতিপক্ষের পক্ষে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই জায়গাতেই ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিমান পরিবর্তনের সঙ্গে পুতিনের কৌশলের তুলনা করেছেন সাংবাদিক মিখাইল রুবিন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো—ট্রাম্প যেখানে এমন কৌশল ব্যবহারের পথে মাত্র এগোচ্ছেন, পুতিন বহুদিন ধরেই নিজের গতিবিধি আড়াল করার বিষয়টিকে আরও জটিল পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version