ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ নিরসনে সীমিত আকারে ভূমি বিনিময়ের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমান্তের কয়েকটি অমীমাংসিত অংশ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং বিষয়টি এখন অভ্যন্তরীণভাবে পর্যালোচনার পর্যায়ে আছে। অনুমোদন মিললে নতুন সীমান্ত সমঝোতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরামের সঙ্গে মিয়ানমারের প্রায় ১,৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্তের অধিকাংশ অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ চললেও মণিপুরের চান্দেল জেলার কয়েকটি বিতর্কিত এলাকায় সীমান্ত নির্ধারণ না হওয়ায় কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি।
ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩.৭২ বর্গকিলোমিটার (প্রায় ১.৪৪ বর্গমাইল) এলাকা বিনিময়ের একটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। সীমান্ত চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা গেলে নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণ আরও সহজ হবে বলে মনে করছে নয়াদিল্লি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, সীমান্তের কিছু অংশ এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। উভয় দেশ আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণে ভারত সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন গুরুত্ব দিচ্ছে। মিয়ানমারের চলমান সংঘাত পরিস্থিতিও সীমান্ত নিরাপত্তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেন নেক’ করিডরের নিরাপত্তাও এই উদ্যোগের কৌশলগত প্রেক্ষাপটের অংশ হতে পারে। যদিও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত সমঝোতা ও চিকেন নেকের মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেনি।
ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দাবি, দুর্গম সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাদক, অস্ত্র ও অন্যান্য অবৈধ পণ্যের চোরাচালান এবং অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে। তাই পুরো সীমান্তে নজরদারি ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে সম্ভাব্য ভূমি বিনিময় নিয়ে মণিপুরের কয়েকটি স্থানীয় সংগঠন আপত্তি জানিয়েছে। তাদের দাবি, সীমান্ত সমাধানের নামে ভারতের কোনো ভূখণ্ড অন্য দেশের কাছে হস্তান্তর করা উচিত নয়।
অন্যদিকে, মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমান্তবর্তী অনেক এলাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থাকায় ভবিষ্যতে কোনো সমঝোতা বাস্তবায়ন কতটা সহজ হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ভারত একই সঙ্গে কালাদান বহুমুখী পরিবহন প্রকল্প এবং ভারত–মিয়ানমার–থাইল্যান্ড মহাসড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব প্রকল্প সফল করতে সীমান্তে স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, এর আগে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছিল ভারত। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবার মিয়ানমারের সঙ্গেও সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, স্থানীয় আপত্তি এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এ প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোবে, তা এখনও অনিশ্চিত।

