বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে কমেনি লোডশেডিং কিংবা আর্থিক সংকট। উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির কারণে সরকারের ভর্তুকির বোঝা বাড়ছে, পাশাপাশি জমেছে বিপুল অঙ্কের বকেয়া বিল। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে সরকার।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও সরকারের হিসাব অনুযায়ী এ খাতে আরও প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে। এই চাপ কমানোর লক্ষ্যেই নতুন ব্যবস্থাপনার চিন্তা করা হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। তবে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, বিল আদায় এবং বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে।
তবে এই প্রস্তাব সামনে আসার পরই বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, শুধু দায়িত্ব পরিবর্তন করলেই কি বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা দূর হবে, নাকি এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়বে সাধারণ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিলের ওপর?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশের মতে, বিদ্যুৎ খাতের সংকটের মূল কারণ ব্যবস্থাপনাগত ও নীতিগত দুর্বলতা। গত দেড় দশকে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও পরিকল্পনার অভাব, অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ এবং আমদানিনির্ভর নীতির কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি। তাই কেবল বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারি খাতে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণার সঙ্গে তারা একমত নন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছাড়া বেসরকারিকরণ করলে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, সেবার বৈষম্য এবং গ্রাহক ভোগান্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম ও কম লাভজনক এলাকায় সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টারা মনে করেন, বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে বেসরকারিকরণের সুফলের চেয়ে কুফলই বেশি হতে পারে। তাদের মতে, এলপিজি খাতের অভিজ্ঞতা দেখায় যে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বাজার পুরোপুরি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে মূল্য নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন সঠিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বিল আদায়, সিস্টেম লস কমানো এবং সেবার দক্ষতা বাড়তে পারে। যুক্তরাজ্য, ভারত ও তুরস্কের অভিজ্ঞতাকে তারা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তবে তাদেরও মত, সফলতার পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
সরকার বলছে, বর্তমানে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে কম দামে সরবরাহ করছে। এই মূল্য ব্যবধান পূরণে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়লে বিল আদায় সহজ হবে, চুরি কমবে এবং সরকারের আর্থিক চাপও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে বিদেশের কয়েকটি শহরে বেসরকারি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সফল উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে সরকার স্পষ্ট করেছে, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা এবং সমীক্ষা চালিয়ে এরপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বিদ্যুৎ খাতে টেকসই সংস্কার আনতে হলে শুধু মালিকানা বা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের চেয়ে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
