বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে সংযুক্ত করে একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের প্রস্তাব আঞ্চলিক কূটনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। তবে নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাসহ একাধিক জটিলতা প্রকল্পটির সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চীনের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য হলো দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে ইউনান প্রদেশকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করা। বর্তমানে চীনের বড় অংশের সমুদ্রবাণিজ্য মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প রুট তৈরি করতে বেইজিং ইতোমধ্যে মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, তেল-গ্যাস পাইপলাইন এবং চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরে বিনিয়োগ করেছে। নতুন পরিকল্পনায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর যুক্ত হলে চীনের জন্য বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ আরও সহজ হতে পারে।
যদিও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক রুট নির্ধারণ করা হয়নি, তবুও সম্ভাব্য পরিকল্পনায় কুনমিং থেকে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল হয়ে টেকনাফ, কক্সবাজার এবং চট্টগ্রাম পর্যন্ত সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথভিত্তিক একটি সমন্বিত মাল্টিমোডাল করিডোরের ধারণা আলোচনায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডোর চালু হলে পণ্য পরিবহনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। বর্তমানে সমুদ্রপথে যে পরিবহন কয়েকদিন সময় নেয়, স্থলপথ চালু হলে তা অনেক কম সময়ে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ট্রানজিট ও লজিস্টিকস কেন্দ্র হিসেবে নতুন সুযোগ পেতে পারে।
তবে প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ। রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সম্ভাব্য করিডোরের বড় অংশ ওই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যত আরাকান আর্মির সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গেও সমন্বয় অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীন দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। ফলে ভবিষ্যতে করিডোর বাস্তবায়নে প্রয়োজন হলে বেইজিং মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগ নিয়ে ভারতেরও কৌশলগত উদ্বেগ রয়েছে। নয়াদিল্লির আশঙ্কা, বাংলাদেশের বন্দরগুলোতে চীনের সম্পৃক্ততা বাড়লে ভারত মহাসাগরে বেইজিংয়ের প্রভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চীনের স্থল সংযোগ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
একসময় বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) করিডোর বাস্তবায়নের চেষ্টা হলেও তা অগ্রসর হয়নি। নতুন ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগকে অনেক বিশ্লেষক সেই ধারণার নতুন রূপ হিসেবে দেখছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, এই করিডোর কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং এটি মূলত অর্থনৈতিক সংযোগের উদ্যোগ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগ্রহী যেকোনো দেশ এতে অংশ নিতে পারে এবং ভবিষ্যতে এটি আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি আরও মনে করেন, অর্থনৈতিক যোগাযোগ জোরদার হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, করিডোরটি দেশের বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য উপকারী হতে পারে কি না, সম্ভাব্য ঝুঁকি ও কৌশলগত দিক বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির ব্যয়, রুট বা বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, শুরুতে বিদ্যমান সড়ক ও বন্দর অবকাঠামো ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে ট্রানজিট চালুর চিন্তা থাকতে পারে। পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন রেললাইন ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডোর বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় শর্ত অর্থায়ন নয়; বরং মিয়ানমারে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং ভারত-চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার গতিপ্রকৃতিও প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়িত হলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ প্রকল্পে পরিণত হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর।

