বাণিজ্যিক মহাকাশ খাতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিক রকেটের সাফল্য বিশ্বজুড়ে নতুন প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে। তবে এ ধারার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে চীন। দেশটির গবেষকেরা এমন একটি তড়িৎচৌম্বক (ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক) উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতে রকেট উৎক্ষেপণের প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিতে পারে।
পরিকল্পনাটি সফল হলে রাসায়নিক জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বৈদ্যুতিক শক্তির মাধ্যমে উৎক্ষেপণের প্রাথমিক ধাপে রকেটকে উচ্চগতিতে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে। এতে জ্বালানি ব্যয় কমার পাশাপাশি বহনক্ষমতা বাড়তে পারে এবং মহাকাশে পণ্য বা উপগ্রহ পাঠানোর মোট খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
চীনের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে উচ্চ-তাপমাত্রার অতিপরিবাহী (সুপারকন্ডাক্টিং) প্রযুক্তিনির্ভর একটি নেভিগেশন ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। গত মার্চে দেশটির একটি স্থানীয় প্রশাসন জানায়, এ ধরনের প্রযুক্তির সফল পরীক্ষার মাধ্যমে তড়িৎচৌম্বক রকেট উৎক্ষেপণ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। গবেষকদের লক্ষ্য হলো উৎক্ষেপণের প্রথম ধাপে রকেটকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে ত্বরান্বিত করে রাসায়নিক ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা কমানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হলে উৎক্ষেপণের দক্ষতা বাড়বে, একই সঙ্গে আরও ঘন ঘন ও তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব মহাকাশ মিশন পরিচালনা করা সহজ হতে পারে। যদিও প্রকল্পটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, এটি উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তি ও সুপারকন্ডাক্টিং প্রকৌশলে চীনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগেরই প্রতিফলন।
একজন বেইজিংভিত্তিক মহাকাশ বিশেষজ্ঞের ভাষ্য অনুযায়ী, চিংহাই-তিব্বত মালভূমির উচ্চতা ও পাতলা বায়ুমণ্ডল এমন প্রযুক্তির জন্য বিশেষভাবে উপযোগী হতে পারে। কারণ, সেখানে বায়ুর প্রতিরোধ তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রচলিত রকেট ইঞ্জিন চালুর আগেই রকেটকে অধিক কার্যকরভাবে গতি দেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে তিনি স্বীকার করেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বহু প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এখন পর্যন্ত চীন আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো বৈদ্যুতিক রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা দেয়নি। ফলে বিষয়টি এখনও গবেষণা ও সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে। তবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট, চন্দ্র অভিযান, স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এবং বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ খাতে দেশটির ধারাবাহিক বিনিয়োগ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতের মহাকাশ প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব নেওয়ার লক্ষ্যেই তারা নতুন নতুন উদ্ভাবনে জোর দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, তড়িৎচৌম্বক উৎক্ষেপণ প্রযুক্তি সফল হলে তা শুধু উৎক্ষেপণ ব্যয় কমাবে না, বরং মহাকাশে প্রবেশের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা অর্জন এবং বৈশ্বিক মহাকাশ শিল্পে নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
