
বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে সম্প্রতি কেপ ভার্দের নাম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এই আটলান্টিক মহাসাগরঘেরা ছোট্ট দ্বীপদেশটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখানে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করা মুসলিম সম্প্রদায়। জনসংখ্যার তুলনায় সংখ্যায় কম হলেও দেশটির অর্থনীতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে মুসলিমদের অবদান ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
২০২১ সালের সরকারি জনশুমারি অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ লাখ জনসংখ্যার কেপ ভার্দেতে মুসলিমদের সংখ্যা আনুমানিক পাঁচ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। অধিকাংশ মুসলিমই সেনেগাল, গিনি-বিসাউ ও মালি থেকে আগত অভিবাসী। রাজধানী প্রাইয়া ছাড়াও মিনদেলো, সাল ও বোয়া ভিস্তা দ্বীপে তাদের বসবাস বেশি।
স্থানীয় মুসলিমদের বড় একটি অংশ ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, পরিবহন, নির্মাণশিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। ধর্মীয়ভাবে তারা মূলত সুন্নি মুসলিম এবং পশ্চিম আফ্রিকার তিজানিয়া ও মুরিদ সুফি ধারার সাংস্কৃতিক প্রভাব তাদের জীবনযাত্রায় স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
কেপ ভার্দেতে ইসলামের ইতিহাস শুরু হয় পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক যুগে। ১৫শ শতকে আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের সময় পশ্চিম আফ্রিকা থেকে বহু মুসলিম ব্যবসায়ী ও দাস এই দ্বীপে আসেন। তবে সে সময় ঔপনিবেশিক প্রশাসন ক্যাথলিক ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়ায় মুসলিমদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়। অনেককে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয় এবং প্রকাশ্যে ইসলাম পালন প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
তবুও ইতিহাসের সেই অধ্যায়ের কিছু স্মৃতি আজও টিকে আছে। স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা এবং কিছু সামাজিক রীতিনীতিতে পশ্চিম আফ্রিকান মুসলিম ঐতিহ্যের প্রভাব এখনও লক্ষ্য করা যায়।
১৯৭৫ সালে স্বাধীনতার পর কেপ ভার্দে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। এরপর মুসলিমরা স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার সুযোগ পান এবং ধীরে ধীরে নিজেদের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৯০ সালে রাজধানী প্রাইয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম সরকারি স্বীকৃত মসজিদ, যা বর্তমানে মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
পরবর্তী সময়ে পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে মুসলিম অভিবাসীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালে ধর্মীয় সংগঠন নিবন্ধনের নতুন আইনি কাঠামো চালুর পর মুসলিম সংগঠনগুলো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা লাভ করে।
সংখ্যায় ছোট হলেও কেপ ভার্দের মুসলিম সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি এবং সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে। তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিকভাবে ছোট একটি দেশেও ইসলামের বিকাশ ধীর কিন্তু স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে যেতে পারে।