নিজস্ব প্রতিবেদক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা

গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটি প্রথম বাজেট। সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’-র পথে এগিয়ে নেওয়া।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব

প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এজন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

উদ্যোক্তা ও এসএমই খাতে বিশেষ তহবিল

বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে।

এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে।

আসছে ‘ই-হেলথ কার্ড’

সরকার ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। একইসঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নতুন কিছু কর্মসূচি যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

যুব উন্নয়নে ৩০০ কোটি টাকার প্রস্তাব

যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখতে এবং সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হতে পারে।

অর্থনীতির লক্ষ্য ও বাজেট ঘাটতি

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ, আর মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ

ব্যবসা সহজ করতে ‘বাংলাবিজ’

এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা। লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থায় সংস্কার এনে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম আরও ডিজিটাল করা হবে। অনলাইনে কর রিটার্ন দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও চালুর প্রস্তাব আসতে পারে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের আশা, রাজস্ব সংগ্রহ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো চ্যালেঞ্জ থাকলেও চলমান সংস্কার কার্যক্রম দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version