দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দ্রাবিড় আদর্শভিত্তিক দুই প্রধান দল—দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজগম (ডিএমকে) এবং সর্বভারতীয় আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজগম (এআইএডিএমকে)—এর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৬৭ সালে কংগ্রেসের পতনের পর থেকে এই দুই দলের পালাবদলের রাজনীতিই রাজ্যের ক্ষমতার মূল কেন্দ্র হয়ে আছে। ভাষা, আঞ্চলিক পরিচয় ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক কাঠামোকে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হতো।

এই শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিসরেই নতুন শক্তি হিসেবে উঠে এসেছেন দক্ষিণী সুপারস্টার জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, যিনি থালাপাতি বিজয় নামে পরিচিত। ২০২৪ সালে তার নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দল ‘তামিলগা ভেট্রি কাজগাম’ (টিভিকে) অল্প সময়েই রাজ্য রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের দ্বিমুখী রাজনীতিতে নতুন এই তৃতীয় শক্তির উত্থান তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দ্রাবিড় রাজনীতির ইতিহাস

দ্রাবিড় রাজনীতির সূচনা হয় পেরিয়ারের ‘আত্মসম্মান আন্দোলন’-এর মাধ্যমে, যা ব্রাহ্মণ্যবাদ ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়েছিল। পরে সি.এন. আন্নাদুরাই এই আদর্শকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে ডিএমকে গঠন করেন। ১৯৬৭ সালে ডিএমকে ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা হয়।

পরবর্তীতে এম.জি. রামচন্দ্রন (এমজিআর) ডিএমকে থেকে বের হয়ে এআইএডিএমকে গঠন করলে রাজ্যে আরেকটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ডিএমকে-এআইএডিএমকে দ্বৈত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়।

বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান

বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ভক্তদের সংগঠন ‘বিজয় মক্কাল ইয়াক্কাম’-এর মাধ্যমে, যা ২০০৯ সাল থেকে সামাজিক কার্যক্রমে সক্রিয় ছিল। ধীরে ধীরে এই সংগঠন রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।

তার চলচ্চিত্র জীবনও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গঠনে ভূমিকা রাখে। ‘সরকার’, ‘মার্সাল’ এবং ‘কাথি’র মতো সিনেমায় তিনি দুর্নীতি, করব্যবস্থা এবং সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান তুলে ধরেন, যা তাকে ‘জনতার পক্ষে দাঁড়ানো নায়ক’ হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে।

রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশ

২০২৪ সালে বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করে টিভিকে দল গঠন করেন এবং অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, তার লক্ষ্য প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বিকল্প তৈরি করা।

তার ভাষায়, “রাজনীতি সিনেমা নয়, এটি একটি সংগ্রামের ক্ষেত্র।”

নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক চিত্রে টিভিকে কিছু আসনে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। এতে দীর্ঘদিনের ডিএমকে-এআইএডিএমকে দ্বৈত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বিজয় নিজেকে বিজেপি ও ডিএমকে উভয়ের বাইরে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তার দল এককভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা তাকে অন্যান্য তারকা-রাজনীতিবিদদের থেকে আলাদা করেছে।

একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের উত্থান শুধু একজন চলচ্চিত্র তারকার রাজনীতিতে প্রবেশ নয়, বরং নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা, দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব এবং বিকল্প নেতৃত্বের চাহিদার প্রতিফলন।

চূড়ান্ত ফলাফল যাই হোক না কেন, তামিলনাড়ুর ‘দ্রাবিড় দুর্গ’-এ নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে থালাপাতি বিজয় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version