রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে (রিয়্যাক্টর) জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিং শুরুর খবরের পর অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন এসেছে—এখানকার ইউরেনিয়াম কি পরমাণু বোমা তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে? বাস্তবতা হলো: রূপপুর প্রকল্পের কাঠামো, জ্বালানির ধরন এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির কারণে রূপপুর থেকে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র বানানো কার্যত অসম্ভব। কেন—তা সংক্ষেপে বোঝা যাক।

১) ইউরেনিয়াম কী এবং কেন “সমৃদ্ধকরণ” দরকার?

প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে প্রধানত দুই ধরনের আইসোটোপ থাকে—ইউ-২৩৮ইউ-২৩৫

  • ইউ-২৩৮-এর অংশটাই বেশি (প্রায় সবটাই)
  • কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কার্যকর ফিশনযোগ্য অংশ হলো ইউ-২৩৫, যার পরিমাণ খুব কম

এই কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার উপযোগী করতে ইউ-২৩৫-এর অনুপাত কিছুটা বাড়ানো হয়—এটিকেই সাধারণভাবে সমৃদ্ধকরণ (enrichment) বলা হয়। (এখানে কীভাবে যন্ত্র/পদ্ধতিতে সমৃদ্ধকরণ হয়—সে ধরনের কারিগরি নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে না।)

২) বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়াম আর বোমার ইউরেনিয়াম এক নয়

এখানেই মূল পার্থক্য:

  • পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানি সাধারণত কম সমৃদ্ধ (low enriched uranium)—প্রায় ৩–৫% মাত্রার কাছাকাছি। এতে নিয়ন্ত্রিতভাবে শক্তি বের করে বিদ্যুৎ বানানো হয়।
  • পারমাণবিক অস্ত্রে সাধারণত প্রয়োজন হয় অস্ত্রমানের (weapon-grade) উপাদান, যার ক্ষেত্রে সমৃদ্ধতার মাত্রা অনেক বেশি (প্রচলিতভাবে প্রায় ৯০%-এর কাছাকাছি বলা হয়)।

অর্থাৎ, রূপপুরের জ্বালানি যে মাত্রায় আসে, তা অস্ত্র তৈরির মানের নয়—আর সেই মাত্রায় উন্নীত করার জন্য আলাদা, অত্যন্ত জটিল উচ্চপ্রযুক্তির অবকাঠামো লাগে, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে থাকে না।

৩) রূপপুরে যা হয়: নিয়ন্ত্রিত শক্তি উৎপাদন

রূপপুরে রিয়্যাক্টরের ভেতরে পরমাণু বিভাজনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপ দিয়ে পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে টারবাইন ঘোরায়, আর সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এটি নিয়ন্ত্রিত, ধীরগতির এবং বহুস্তরের সুরক্ষা ব্যবস্থাসম্পন্ন একটি প্রক্রিয়া।

অস্ত্রে যে ধরনের “এক মুহূর্তে অনিয়ন্ত্রিত” শক্তিমুক্তির ব্যবস্থা লাগে, রূপপুর প্রকল্পে সে ধরনের উদ্দেশ্য, নকশা বা সেটআপ নেই।

৪) আন্তর্জাতিক তদারকি ও জ্বালানির হিসাব-নিরীক্ষা

রূপপুর প্রকল্প আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর সেফগার্ডস/নজরদারির আওতায় পরিচালিত। সাধারণভাবে এমন প্রকল্পে—

  • জ্বালানি কত এলো, কোথায় রাখা হলো, কত ব্যবহার হলো—সবকিছুর হিসাব থাকে
  • বেসামরিক কাজে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা ও পরিদর্শন/রিপোর্টিং ব্যবস্থা থাকে

রূপপুরের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পকে ব্যবহার করে গোপনে অস্ত্র কর্মসূচি চালানো তাই বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন।

সারসংক্ষেপ

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বোমা তৈরির প্রকল্প নয়। এখানে যে জ্বালানি ব্যবহৃত হয় তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্ধারিত কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, এবং প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক নজরদারি ও নিয়মকানুনের মধ্যে পরিচালিত—ফলে রূপপুর থেকে পরমাণু বোমা বানানো বাস্তবসম্মত নয়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version