আসামে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্যের বাংলাভাষী মুসলিম বা ‘মিঁয়া’ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। সম্প্রতি ডিব্রুগড়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রকাশ্যে বলেন, নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে নির্দিষ্টভাবে মুসলিম নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত ২৭ জানুয়ারি থেকে চলমান বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআর) কার্যক্রমে শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই জনগোষ্ঠীকে প্রশাসনিক চাপের মধ্যে না রাখলে তারা আসামের জমি, সম্পত্তি ও রাজনৈতিক অধিকার দখল করে নিতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই এই কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

এমনকি তিনি সাধারণ মানুষকে উসকানি দিয়ে বলেছেন, মুসলিম অটোচালকদের কম ভাড়া দেওয়া বা প্রয়োজনে তাদের ওপর শারীরিক আক্রমণ করাও এখন ‘অসমীয়া অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’। হিমন্তের এই প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক অবস্থানকে মানবাধিকার কর্মীরা ‘বিপজ্জনক রাষ্ট্রীয় উসকানি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আসাম বিধানসভার বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে এক জরুরি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো একটি আইনি প্রক্রিয়াকে নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভোটাধিকার হরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গুয়াহাটি হাইকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবীরাও মনে করছেন, একজন মুখ্যমন্ত্রী যখন নিজেই আইন লঙ্ঘনের নির্দেশ দেন, তখন বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ ছাড়া নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। তারা আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে এই বিষয়ে মামলা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

আসামের বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠন ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই বয়ান নিছক কোনো নির্বাচনী স্লোগান নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত জাতিগত বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে ভোটার তালিকা থেকে ‘৪ থেকে ৫ লাখ মিঁয়া ভোট’ ডিলিট করার হুমকি সরাসরি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সমালোচকদের মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতেই মুখ্যমন্ত্রী ‘আদি বাসিন্দা বনাম অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বিতর্ককে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন, যার বলি হতে হচ্ছে দশকের পর দশক ধরে সেখানে বসবাসরত বৈধ ভারতীয় নাগরিকদের। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও ভারতের এই উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version