প্রতিষ্ঠার ১৩৮ বছরের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ রাজস্ব আয় ও রাজস্ব উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। ২০২৫ অর্থবছরে সব ব্যয় বাদ দিয়ে বন্দরের হাতে উদ্বৃত্ত থাকছে প্রায় ৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৬০ দশমিক ১৮ কোটি টাকা, বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩১৭ দশমিক ৫০ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব উদ্বৃত্ত হয়েছে ৩ হাজার ১৪২ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা।

গত পাঁচ অর্থবছরে বন্দরের আর্থিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে রাজস্ব উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ৯২৩ দশমিক ১৭ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ২ হাজার ১৪৩ দশমিক ১১ কোটি টাকা, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ দশমিক ২০ কোটি টাকা এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৩৩ দশমিক ২৬ কোটি টাকা। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রাজস্ব আয়ে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং রাজস্ব উদ্বৃত্তের গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে রাজস্ব ব্যয়ের গড় প্রবৃদ্ধি সীমিত রাখা হয়েছে ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশের মধ্যে। এই পাঁচ অর্থবছরে ভ্যাট, কর ও করবহির্ভূত আয় হিসেবে জাতীয় কোষাগারে মোট ৭ হাজার ৫৮০ দশমিক ২০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বন্দর ব্যবহারকারীরা মনে করছেন, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে সর্বশেষ অর্থবছরে আয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম আবু তৈয়ব বলেন, বন্দর চ্যানেলের সীমা বৃদ্ধি, আগের চেয়ে গভীরতার জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা, আমদানি-রপ্তানির চাহিদা বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং কাস্টমসে নতুন জনবল নিয়োগের ফলে বন্দরের সার্বিক কাজে গতি বেড়েছে, যার প্রভাব রাজস্ব আয়ে পড়েছে।

তবে এই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে নতুন বছরে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও বন্দর সংশ্লিষ্টরা। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আমিনুল হক বলেন, আয় বাড়লেও এখনো বিদেশি জাহাজকে পণ্য নিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। বে টার্মিনালের কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর এবং এনসিটি টার্মিনাল কে পরিচালনা করবে—সে বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। বন্দরে খালি কনটেইনারে করে বিদেশে মানুষ পাচারের ঘটনাও ঘটেছে, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, আগের তুলনায় সর্বশেষ অর্থবছরে বন্দর অনেক ভালো করেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, বন্দরের আয় থেকে প্রতিবছরই জাতীয় কোষাগারে বড় অঙ্কের অর্থ জমা দেওয়া হচ্ছে এবং বন্দরকে আরও গতিশীল করার সুযোগ রয়েছে। তিনি জানান, লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, বে টার্মিনালের ব্রেকওয়াটার নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে, এনসিটি টার্মিনাল নিয়েও চলতি বছর সিদ্ধান্ত আসবে। পতেঙ্গা টার্মিনাল বর্তমানে সৌদি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় রয়েছে এবং সর্বশেষ অর্থবছরের শেষ দিকে নতুন আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত হওয়ায় সক্ষমতা বেড়েছে।

ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর নীতি অনুসরণের তাগিদ দিয়েছেন মিউচুয়াল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ আহমেদ। তিনি বলেন, গত দুই বছর রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়েছে, তবে ২০২৩ সালে তা ১০ দশমিক ১৮ শতাংশে পৌঁছেছিল। ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সেবার মান আরও বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।

১৮৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে বিশ্বের ১১০টি দেশের সঙ্গে সংযুক্ত। বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বিভিন্ন বিভাগকে অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে এবং ৫০টি সফটওয়্যার মডিউলের মাধ্যমে পেপারলেস সিস্টেম চালুর কাজ এগোচ্ছে। বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বর্তমানে কনটেইনারবাহী জাহাজ বহির্নোঙরে আসার এক থেকে দুই দিনের মধ্যে জেটিতে ভিড়তে পারছে এবং অন-অ্যারাইভাল বার্থিং সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে, যা আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গতি এনেছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্প্রতি পোর্ট লিমিট ৭ নটিক্যাল মাইল থেকে ৬২ নটিক্যাল মাইলে উন্নীত করা হয়েছে। দুটি আধুনিক কনটেইনার স্ক্যানার সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে ২১০ মিটার দৈর্ঘ্য ও সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে। বে টার্মিনাল ও মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প সম্পন্ন হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা তিন থেকে চার গুণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

রপ্তানি খাতেও বন্দরের উন্নয়নের প্রভাব পড়েছে। আগে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপগামী তৈরি পোশাকের কনটেইনার সিঙ্গাপুর, কলম্বো বা পোর্ট কেলাং হয়ে যেতে ২৮ থেকে ৩০ দিন সময় লাগত এবং খরচ হতো প্রায় ২০ হাজার মার্কিন ডলার। এখন সরাসরি ইউরোপগামী শিপিং সার্ভিস চালু হওয়ায় সময় ও ব্যয় কমেছে এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ বেড়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর ৩৪ লাখের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে, যা ১৩৮ বছরের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড।

সব মিলিয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আয় অর্জন করলেও অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং জাহাজ জট কমানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলেই চট্টগ্রাম বন্দর ভবিষ্যতে আরও বড় আয়ের পথে এগোতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version