কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছিল। ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বৃহৎ বিমানবাহী রণতরীসহ বিশাল সৈন্য সমাবেশ করেছিল। ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা বন্ধ ও জলসীমায় ব্লকেডের কারণে দেশটিতে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি সীমিত অভিযানে শুধু ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘গ্রেপ্তার’ করে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স তাদের কার্যক্রম শেষ করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দেশটির কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তিনি এমনকি ভেনেজুয়েলার বিতর্কিত তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণও নিজের হাতে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আইনকে একপ্রকার ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখিয়ে ট্রাম্পের নেয়া এমন পদক্ষেপের সরাসরি নিন্দা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্ররা। দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোও রয়েসয়ে ‘প্রতিবাদ’ জানাচ্ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ‘শত্রু’ হিসেবে পরিচিত রাশিয়া, চীন, কলম্বিয়া, ইরানের মতো দেশগুলো মাদুরোকে আটক এবং ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বে আঘাতের প্রতিবাদ জানিয়েছে।
তবে এসবের মধ্যেই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদনে মিলেছে ‘অন্যরকম’ তথ্য। ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাটি সম্ভবত কোনো সামরিক গ্রেপ্তার নয়; বরং এটি ছিল আলোচনার মাধ্যমে ‘সেফ এক্সিট’।
যেখানে মাদুরোর পতনে দেশটির বিরোধী শক্তিগুলোর সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা, সেখানে তারাই এই ‘আটক’ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে এভাবে তুলে নিয়ে গেল আরেক দেশ, অথচ স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী ন্যূনতম প্রতিরোধও গড়ল না, এই বিষয়টি অবিশ্বাস্য ঠেকছে তাদের কাছে।
ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলা কোনো প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্র নয়। বহু বছর ধরে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি এবং গোয়েন্দা চাপের মধ্যে রয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী চাপের কারণেই ভেনেজুয়েলার সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
এই বাস্তবতার আলোকে, মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে প্রবেশের পর প্রেসিডেন্টকে আটক করে এবং উল্লেখযোগ্য কোনো সংঘর্ষ বা প্রতিরোধ ছাড়াই সরে যেতে পারে—এমন ধারণা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে মেলানো কঠিন।
এদিকে উত্তেজনার মধ্যেই গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প এবং মাদুরোর ফোনালাপ হয়েছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট তখন বলেছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার ফোনালাপ ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ’ ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফোনালাপের কথা স্বীকার করলেও এর বেশি কিছু জানাতে রাজি হননি।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মাদক পাচার দমনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। গত সপ্তাহে তার দেশের একটি বন্দরে ড্রোন হামলা চালায় সিআইএ। কিন্তু আটকের আগপর্যন্ত এই হামলার বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি মাদুরো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি যদি মাদুরোকে সেফ এক্সিট দেয়ার মতো ঘটনা হয়েও থাকে, তবুও একে সামরিক বিজয় হিসেবেই উল্লেখ করবে ওয়াশিংটন। কারণ এমন প্রচারের ফলে ইরান, কলম্বিয়াসহ যেসব দেশ প্রকাশ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধিতা করছে, তাদের জন্য এটা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নেয়া হয়েছে। সেখানে মাদক চোরাচালানের অভিযোগে করা মামলায় তাকে জিজ্ঞাবাসাদ করা হচ্ছে।
