মুখের ভেতরের ভাঙা বা ধারালো দাঁতের কারণে হওয়া ক্ষতকে অনেকেই তেমন গুরুত্ব দেন না। কিন্তু জিহ্বা বা গালে বারবার লাগা এই ছোটখাটো ক্ষত দীর্ঘমেয়াদে রেখে দিলে তা নীরবে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। তামাক ও অ্যালকোহলজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার এবং সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়ার প্রবণতার কারণে দেশে ওরাল (মুখের ভেতরের) ক্যান্সারের ঝুঁকি ও মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডেন্টাল অনুষদের ডিন ও ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন। মুখের ক্ষত ও ক্যান্সার প্রতিরোধের উপায় নিয়ে কথা বলার সময় তিনি জানান, মুখে নানা কারণে ক্ষত বা ঘা হতে পারে, যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ‘অ্যাপথাস আলসার’।

ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ আরও বলেন, ‘মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, ঘুমের ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন, ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব, ব্রাশের খোঁচা বা খাওয়ার সময় অসাবধানতাবশত গাল বা জিহ্বায় কামড় লাগলে এই ঘা হতে পারে। এটি কষ্টদায়ক হলেও এতে ভয়ের কিছু নেই। এই আলসার সাধারণত ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে কোনো ওষুধ ছাড়াই নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে এ সময় সামান্য ব্যথানাশক জেল বা মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে স্বস্তি মেলে।’

তবে সব ক্ষত সাধারণ নয় উল্লেখ করে ডা. সাখাওয়াৎ বলেন, ‘কিছু ক্ষত শরীরের অন্য কোনো জটিল রোগের লক্ষণ হিসেবে প্রকাশ পায়। যেমন, যক্ষা রোগীদের ক্ষেত্রে ‘টিউবারকুলাস আলসার’, সিফিলিস রোগীদের ‘সিফিলিটিক আলসার’ কিংবা হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের সংক্রমণে জ্বরঠোসা বা ফোসকা থেকেও মুখে ঘা হতে পারে। এর বাইরে কিছু ক্ষত আছে যাকে ‘প্রি-ম্যালিগন্যান্ট লেসন’ বা ক্যান্সারের পূর্বাবস্থার ক্ষত বলা হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এবং জীবনযাপন পদ্ধতি পরিবর্তন না করলে এগুলো ক্যান্সারে রূপ নেয়। এর মধ্যে লিউকোপ্লাকিয়া (সাদা ঘা), এরিথ্রোপ্লাকিয়া (লালচে ঘা), লাইকেন প্ল্যানাস (এলপি) এবং ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস (ওএসএমএফ) অন্যতম।’

ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস (ওএসএমএফ) সম্পর্কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিএমইউ’র এ চিকিৎসক বলেন, ‘ওএসএমএফ-এর প্রধান কারণ হলো সুপারি। আমাদের দেশে অনেকেই পানের সাথে কিংবা শুধু শুধু সুপারি চিবান। যারা দীর্ঘসময় মুখে সুপারি রাখেন বা পান-সুপারি চিবান, তাদের মুখের ভেতরের পাতলা মিউকাস ঝিল্লির নিচের অংশ (সাবমিউকাস) ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়। একসময় এটি টান দেওয়া রশির মতো হয়ে যায় বা অনেকটা অংশ শক্ত হয়ে যায়, যা ফাইব্রোসিস নামে পরিচিত। এতে মুখ হা করতে সমস্যা হয়। একইসাথে এটি ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া ‘লাইকেন প্যানাস’ নামক অটোইমিউন ডিজিজের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস রোগীদের ঝুঁকি অনেক বেশি। কেননা ডায়াবেটিস কন্ট্রোলে না থাকলে এসব ক্ষত নিয়ন্ত্রণ করা আরও জটিল হয়ে পড়ে।’

মুখের ক্যান্সারের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ বলেন, ‘সরাসরি ক্যান্সার বা ‘স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা’র প্রধান কারণ হলো ধোঁয়াবিহীন তামাক বা চিবিয়ে খাওয়া তামাকজাত দ্রব্য যেমন- গুল, জর্দা, সাদা পাতা ও খৈনি ইত্যাদি। আমাদের দেশে অনেকে পানের সঙ্গে জর্দা, সাদা পাতা খান, আবার অনেকে গুল ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এর পাশাপাশি ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবনও বড় ঝুঁকির কারণ। কেননা, শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যেখানে তামাক ক্ষতি করে না। তবে কেউ যদি ধূমপান, অ্যালকোহল ও জর্দা এই একাধিক অভ্যাসে আসক্ত হন, তবে তার এই ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করে। এছাড়া হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি), যা নারীদের জরায়ু ক্যান্সারের জন্য দায়ী, সেটিও মুখের ক্যান্সারের একটি অন্যতম কারণ হতে পারে।’

দাঁতের যত্ন না নেওয়াও ক্যান্সারের কারণ হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকে মুখের হাইজিন মেইনটেইন করেন না, নিয়মিত দাঁতের যত্ন নেন না, ঠিকমতো ব্রাশ করেন না। এতে করে দাঁতে ভাঙা বা ধারালো অংশ তৈরি হয়ে সেটি জিহ্বা কিংবা গালের ভেতরে বারবার ঘষা লাগতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে একই জায়গায় বারবার দাঁতের কামড় পড়তে থাকে। এতে ওই স্থানে শক্ত ভাব বা ছোট ক্ষত তৈরি হয়। এই ক্ষত যদি দীর্ঘদিন থাকে, যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয়, তবে বারবার আঘাতের কারণে এটি একসময় ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। অনেক সময় বাঁধাই করা আলগা দাঁতের কারণে ক্ষত থেকেও মুখের ক্যান্সার হতে পারে। এছাড়া পুষ্টিহীনতা (ম্যালনিউট্রিশন), বিশেষ করে খাবারে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ সবুজ শাক-সবজি ও ফলের অভাব মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।’

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version