রাতের অন্ধকারেও পাওয়া যাবে সূর্যের আলো! শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এমনই এক প্রযুক্তি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশভিত্তিক স্টার্টআপ রিফ্লেক্ট অরবিটাল। মহাকাশে বিশাল আকারের আয়না স্থাপন করে সূর্যের আলো পৃথিবীর নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিফলিত করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর ফলে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও নির্দিষ্ট এলাকায় কৃত্রিমভাবে দিনের আলোর মতো উজ্জ্বলতা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য শুধু রাতের অন্ধকার দূর করা নয়। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় বাড়ানো, দুর্যোগের সময় বিদ্যুৎহীন এলাকায় আলো সরবরাহ এবং উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এই প্রযুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা।
কীভাবে কাজ করবে মহাকাশের আয়না?
রিফ্লেক্ট অরবিটালের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে প্রায় ১৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৮ মিটার প্রস্থের বিশাল প্রতিফলক স্থাপন করা হবে। এসব আয়না সূর্যের আলো ধরে পৃথিবীর নির্দিষ্ট অঞ্চলে ফিরিয়ে দেবে। ফলে কোনো এলাকায় সূর্য অস্ত যাওয়ার পরও কিছু সময়ের জন্য আলো পাওয়া সম্ভব হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি আয়না প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসের একটি এলাকায় আলো প্রতিফলিত করতে পারবে বলে পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী স্যাটেলাইটের অবস্থান ও আয়নার দিক পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট এলাকায় আলো পাঠানো হবে।
এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য ভারতের মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের সঙ্গে দুটি রকেট উৎক্ষেপণের চুক্তি করেছে কোম্পানিটি। প্রথম পরীক্ষামূলক অভিযান ২০২৭ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০৩৫ সালের মধ্যে ৫০ হাজার স্যাটেলাইট!
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩৫ সালের মধ্যে মহাকাশে প্রায় ৫০ হাজার স্যাটেলাইট স্থাপনের লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই প্রকল্পের পরীক্ষামূলক স্যাটেলাইটের নাম ‘ইয়ারেন্ডিল-১’। ভবিষ্যতে গ্রাহকেরা একটি অ্যাপের মাধ্যমে পৃথিবীর যে এলাকায় আলো প্রয়োজন, সেই স্থান নির্বাচন করতে পারবেন। এরপর মহাকাশে থাকা প্রতিফলকগুলো ব্যবহার করে সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রতিফলিত আলো অনেকটা চাঁদের আলোর মতো হবে। তবে স্যাটেলাইটের সংখ্যা বাড়লে আলোর উজ্জ্বলতা এবং সরবরাহের সময়ও বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ কোথায়?
এই পরিকল্পনা যতটা আকর্ষণীয়, এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও ততটাই আলোচনা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মহাকাশ থেকে প্রতিফলিত আলো শুধু নির্ধারিত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বিস্তৃত অঞ্চলকেও আলোকিত করতে পারে।
২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে এই আলোর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বায়ুমণ্ডলের অণু ও ক্ষুদ্র কণার কারণে প্রতিফলিত আলোর একটি অংশ বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি পৃথিবীর মাটিতে পড়া আলো আবার প্রতিফলিত হয়ে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেও আলোর বিস্তার বাড়াতে পারে।
গবেষণার মডেল অনুযায়ী, আয়না থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরের এলাকাতেও এমন আলোর আভা তৈরি হতে পারে, যা পূর্ণিমার চাঁদের আলোর চেয়ে বেশি উজ্জ্বল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর ফলে যেসব মানুষ এই সেবা গ্রহণ করবেন না, তারাও অনিচ্ছাকৃতভাবে এর প্রভাবে পড়তে পারেন। বিশেষ করে রাতের স্বাভাবিক অন্ধকারের ওপর নির্ভরশীল বন্যপ্রাণী, পাখি এবং বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য মহাকাশ পর্যবেক্ষণও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অনুমোদন পেলেও বাড়ছে বিরোধিতা
প্রকল্পটির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার পরও বিতর্ক থামেনি। কয়েকজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদী সংগঠন এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশনের কাছে অনুমোদন বাতিলের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে মনে রাখতে হবে, গবেষণায় উঠে আসা অনেক প্রভাব এখনো মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস। বাস্তবে প্রযুক্তিটি পরীক্ষার পরই এর কার্যকারিতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
সব মিলিয়ে, মহাকাশ থেকে রাতের বেলায় সূর্যের আলো বিক্রির এই পরিকল্পনা ভবিষ্যতের জ্বালানি ও আলোকব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পাশাপাশি রাতের স্বাভাবিক পরিবেশ ও পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করাও হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
