বিয়ের আশ্বাস দিয়ে ধর্ষণ এবং গোপনে আপত্তিকর ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসমিম মাহিদ চঞ্চলের জামিন আবেদন খারিজ করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তাকে সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বিচারিক আদালত।
হাইকোর্টের বিচারপতি মো. খায়রুল আলম ও বিচারপতি মো. রফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় দেন। গত ১২ অক্টোবর রায়টি প্রকাশিত হয়।
আদালতে অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবী সজীব চন্দ্র বণিক এবং অভিযোগকারীর পক্ষে আইনজীবী শিকদার গুলজার আহমেদ শুনানিতে অংশ নেন। মামলার অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
মামলার এজাহার ও আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধানমন্ডির একটি রেস্তোরাঁর স্মোকিং জোনে ভুক্তভোগীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন তাসমিম মাহিদ চঞ্চল। এ সময় গোপনে আপত্তিকর ছবি তুলে পরবর্তী সময়ে সেগুলো ব্যবহার করে তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করা হয় এবং সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট মধ্যরাতে অভিযুক্তের কথায় ধানমন্ডির একটি হোটেলে যান অভিযোগকারী। সেখানে বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে তাঁদের শারীরিক সম্পর্ক হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন বলে অভিযোগকারীর দাবি। বিয়ের বিষয়ে কথা বললে তাঁর পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেবে না বলে হুমকি দেওয়া হয় বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর আপস-মীমাংসার জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হলেও অভিযুক্ত বিয়ে করতে রাজি হননি বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এরপর একই বছরের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন অভিযোগকারী।
মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ভুক্তভোগীর মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। প্রতিবেদনে শারীরিক সম্পর্কের আলামত পাওয়ার কথা বলা হলেও সেটি সাম্প্রতিক কিংবা জোরপূর্বক ছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। মেডিকেল বোর্ড তাঁর বয়স আনুমানিক ২০ বছর নির্ধারণ করে।
তদন্ত শেষে পুলিশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(খ) ধারায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার ষষ্ঠ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মামলার কার্যক্রমের একপর্যায়ে ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল অভিযুক্ত স্বেচ্ছায় বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ১০ মে পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। তবে ওই তারিখে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
পরে ২৪ মে ট্রাইব্যুনাল তাঁর জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে তিনি হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। চতুর্থ বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবং আপস-মীমাংসার মৌখিক আবেদনের বিষয় বিবেচনা করে হাইকোর্ট তাঁকে শর্তসাপেক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছিলেন।
কিন্তু পরবর্তী শুনানিতে আদালত দেখতে পান, অভিযুক্তের পরীক্ষা শেষ হলেও দুই পক্ষের মধ্যে কোনো আপস-মীমাংসা হয়নি। ফলে জামিন বহাল রাখার ভিত্তি না থাকায় গত ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট তাঁর জামিন আবেদন খারিজ করে রায় দেন।
রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তাসমিম মাহিদ চঞ্চলকে সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি আত্মসমর্পণ না করলে প্রচলিত আইন অনুসারে তাঁকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বিচারিক আদালত।
