মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। শুক্রবার ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে অপরিশোধিত তেল ব্রেন্টের দাম। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম শুক্রবার ৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৬ দশমিক ৭২ ডলারে পৌঁছেছে। গত ২৯ এপ্রিলের পর এটিই তেলটির সর্বোচ্চ সমাপনী মূল্য। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। দিন শেষে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআই তেলের দাম দাঁড়িয়েছে ১০৩ দশমিক ২৭ ডলারে।
সাপ্তাহিক হিসাবেও তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে টানা তিন সপ্তাহ ধরে বাড়ল আন্তর্জাতিক বাজারে এই জ্বালানি তেলের মূল্য। একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ২ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য নতুন সামরিক পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তেল উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে। তাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এদিকে ইরানের সেনাপ্রধান জানিয়েছেন, সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার পর দেশটির সশস্ত্র বাহিনী ‘অসম যুদ্ধের’ জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে এ বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। এমন মন্তব্যের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের সামরিক প্রস্তুতির বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
এর আগে বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আলোচনা চলছে না। পাশাপাশি তিনি মন্তব্য করেন, এ বিষয়ে খুব শিগগিরই কিছু একটা ঘটতে পারে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়।
এরই মধ্যে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা করছেন। তবে এ ধরনের পরিকল্পনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ঘটনাও জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত হুথি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবে হামলা অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে অবস্থানরত জরুরি নয় এমন কর্মীদের দেশটি ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের কর্মীদের ধাহরানে অবস্থিত প্রধান কার্যালয় ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার এবং বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এ অঞ্চলে সামরিক সংঘাত বাড়লে শুধু তেল উৎপাদন নয়, আন্তর্জাতিক নৌপথে জ্বালানি পরিবহনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তখন বাজারে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ার কারণে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ, সৌদি আরবে নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। তবে আগামী দিনে তেলের দাম কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতার ওপর।
