বিশ্ব ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ এক কূটনৈতিক আয়োজনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে জাপানের রাজধানী টোকিও। সেখানে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) কংগ্রেস ঘিরে বিভিন্ন দেশের ফুটবল কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরগরম পাঁচ তারকা হোটেল। কংগ্রেসের শেষ দিনে যোগ দেওয়ার কথা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর। এরই মধ্যে টোকিওতে পৌঁছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ফুটবল প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন তিনি।
ফিফা সভাপতির পরবর্তী নির্বাচনে এশিয়ার ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বের ২১১টি সদস্য দেশের প্রত্যেকেরই ভোটাধিকার রয়েছে। ফলে ফুটবলে বড় শক্তিধর দেশগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভুটানের মতো দেশগুলোর সমর্থনও নির্বাচনী হিসাবের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ।
চতুর্থবারের মতো ফিফা সভাপতি হওয়ার লক্ষ্যে ইনফান্তিনো বিভিন্ন অঞ্চলের সমর্থন নিশ্চিত করতে তৎপর রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এশিয়ার ৪৭টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের এক জায়গায় পাওয়ার সুযোগ থাকায় এএফসির কংগ্রেসকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে দেখছেন।
সম্প্রতি ভুটান সফর করলেও বাংলাদেশে যাননি ইনফান্তিনো। বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টি বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতির সময়ই সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ নিয়ে ফুটবল মহলে আলোচনা রয়েছে। ভুটানে সরাসরি সফর করলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সীমিত সময়ের যোগাযোগে সন্তুষ্ট থাকার বিষয়টি দুই দেশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এদিকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল এবং সহসভাপতি নাসের শাহরিয়ার জাহেদী বর্তমানে টোকিওতে অবস্থান করছেন। তাঁরা ইনফান্তিনোর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করার সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে ফিফা সভাপতির ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যে তাঁদের সঙ্গে বৈঠক হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বাংলাদেশের ফুটবল কর্মকর্তাদের জন্য এএফসির সভাপতি শেখ সালমান বিন খলিফার সঙ্গে যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। ফিফার নির্বাচনে এশিয়ার ভোটের সমীকরণে তাঁর প্রভাব থাকতে পারে। ইনফান্তিনো ও শেখ সালমানের মধ্যে বৈঠক হয়েছে কি না, তা নিয়ে ভিন্ন আলোচনা শোনা গেলেও বিষয়টি নিশ্চিত নয়।
ইনফান্তিনোর সামনে এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জও কম নয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের পরবর্তী আয়োজন নিয়ে তাঁর একটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ফুটবল মহলে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরে তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে এলেও ইউরোপের কয়েকটি পক্ষের বিরোধিতা অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এশিয়ার সমর্থন নিশ্চিত করার তৎপরতার পেছনে এই পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আগামী ৬ ডিসেম্বর কাতারের দোহায় ফিফা কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনে কারা প্রার্থী হবেন, তা চূড়ান্ত হওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা ১৮ নভেম্বর বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন আঞ্চলিক ফুটবল সংস্থার সমর্থন নিশ্চিত করার তৎপরতা আরও বাড়তে পারে।
কাতারে ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনের সময় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইনফান্তিনোর ভূমিকা ছিল বলে তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন। প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবল নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। তবে এশিয়ার নেতারা এবার কোন অবস্থান নেবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এএফসির সভাপতি শেখ সালমানের বক্তব্যেও নিরপেক্ষ অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তিনি বলেছেন, তাঁরা কারও বিরুদ্ধে নন, আবার কারও পক্ষেও নন; ফুটবলের জন্য কোনটি ভালো, সেটিই বিবেচনা করবেন। তাঁর এই অবস্থান নির্বাচনী সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।
এবারের এএফসি কংগ্রেসে সাংবাদিকদের প্রবেশের সুযোগ না থাকায় ভেতরের আলোচনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যে কী সিদ্ধান্ত বা সমঝোতা হচ্ছে, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১১ ভোটের মধ্যে ইনফান্তিনোর পক্ষে ৮৭টি ভোটের সমর্থন নিশ্চিত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আফ্রিকান অঞ্চলের সমর্থনও তাঁর পক্ষে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এশিয়ার ভোট নিশ্চিত করতে পারলে নির্বাচনী হিসাব তাঁর জন্য সহজ হতে পারে। তবে এসব সমর্থনের প্রকৃত চিত্র আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
সব মিলিয়ে, টোকিওর এএফসি কংগ্রেস শুধু এশীয় ফুটবলের নিয়মিত আয়োজন নয়, ফিফার পরবর্তী নেতৃত্ব ঘিরে কূটনৈতিক যোগাযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে বাফুফে নেতারা ইনফান্তিনোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন কি না এবং বাংলাদেশের ফুটবলের স্বার্থে কী ধরনের আলোচনা হয়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।
