ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে)। চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সঙ্গে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে।
গত ৩ অক্টোবর বিরোধী দলগুলোর জোটে যোগ দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আয়োজিত বিক্ষোভে টিভিকের এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। দলটির প্রধান ও তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়কে ঘিরেও এ কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কংগ্রেসের সংসদ সদস্য বি মানিকাম ঠাকুর এবং তামিলনাড়ু প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই বিক্ষোভে ইন্ডিয়া জোটের সাতটি দলের নেতারা অংশ নেন। একই সময়ে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতেও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে।
রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের পর বিজয়ের নতুন রাজনৈতিক পদক্ষেপ
কংগ্রেসের বিক্ষোভে টিভিকের অংশগ্রহণের পেছনে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। গত ১০ অক্টোবর চেন্নাইয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী ও টিভিকে প্রধান সি. জোসেফ বিজয়।
সংবাদমাধ্যম সাউথ ফার্স্টের প্রতিবেদনে কংগ্রেস নেতৃত্বের বরাত দিয়ে জানানো হয়, বিজেপির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনা, প্রচার এবং প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য বিজয় ও তাঁর দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, চেন্নাইয়ের শহরতলি নীলাঙ্করাইয়ে বিজয়ের বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রাহুল। বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যের জন্য বিজয়কে অভিনন্দনও জানান রাহুল গান্ধী। তামিলনাড়ুতে ‘সেক্যুলার সোশ্যাল জাস্টিস ভিক্টরি অ্যালায়েন্স’ গঠনের পর দুই নেতার এই বৈঠককে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এরপরই কংগ্রেসের ডাকা নির্বাচন কমিশনবিরোধী কর্মসূচিতে টিভিকের অংশগ্রহণ নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে এই অংশগ্রহণের ফলে ভবিষ্যতে দুই দলের মধ্যে সহযোগিতা কতটা বাড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ
চেন্নাইয়ের বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক অভিযোগ তোলেন। তাঁদের দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তাঁদের অভিযোগ অনুযায়ী, মুসলিম, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ এর ফলে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, শুধু তামিলনাড়ুতেই ৯৭ লাখের বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যদি যোগ্য ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বক্তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁরা এই প্রক্রিয়াকে গণতন্ত্রের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব থাকলে তার তদন্তের দাবি জানান।
তবে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার সংখ্যা, কারা কী কারণে বাদ পড়েছেন এবং এর পেছনে কোনো পরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল কি না—এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য ও স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
বিরোধী রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
থালাপতি বিজয়ের দল টিভিকে সাম্প্রতিক সময়ে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে আয়োজিত কর্মসূচিতে তাদের অংশগ্রহণ বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচনী অধিকার রক্ষার প্রশ্নে বিরোধী দলগুলো একসঙ্গে আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারবে কি না, তা এখন রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একদিকে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বিজয়ের বৈঠক, অন্যদিকে ইন্ডিয়া জোটের বিক্ষোভে টিভিকের অংশগ্রহণ—এই দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
তবে এখনই বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা স্থায়ী নির্বাচনী জোটের বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। আগামী দিনে টিভিকে ও কংগ্রেসের সম্পর্ক কোন দিকে এগোয় এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।

