ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা এবং চলমান তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস সোসাইটি (এইচআরডিএস), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিট। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা এবং সংশ্লিষ্ট সবার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞপ্তিটি পাঠান সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক তারিফ আহাম্মেদ তুহিন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৬৮ জন শিক্ষক বর্তমানে পাঠদান কার্যক্রমের বাইরে রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত এবং সেগুলোর নিষ্পত্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অগ্রগতি স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

এইচআরডিএস মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত, প্রশাসনিক শাস্তি এবং ফৌজদারি মামলা এক বিষয় নয়। তাই প্রতিটি অভিযোগের ধরন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপ এবং বর্তমান অবস্থা আলাদাভাবে জানানো প্রয়োজন।

এদিকে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের একাংশের একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিভাগীয় বয়কটের কারণে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের দুই শতাধিক নেতাকর্মী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। পরে একই বছরের জুলাইয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১২৮ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে।

সংগঠনটির বক্তব্য, এসব ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অবস্থার বিষয়গুলো পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।

এইচআরডিএস বলেছে, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মতাদর্শ যা-ই হোক, প্রত্যেক নাগরিকের আইনি সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ তদন্ত এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া কিংবা আইনগত ভিত্তি ছাড়া একাডেমিক কার্যক্রমে বাধা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হামলা, নির্যাতনসহ যেসব অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আইনগত অধিকারও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে, তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্বিচারে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

এইচআরডিএসের ছয় দফা দাবি

সংগঠনটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি কতটি মামলা তদন্তাধীন, কতটিতে অভিযোগপত্র জমা হয়েছে এবং কতটি বিচারাধীন রয়েছে, সেই হিসাব স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে।

এ ছাড়া তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটিগুলোর কাজ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং একাডেমিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার কারণ ও আইনগত ভিত্তি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

এইচআরডিএসের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কিংবা বিধিনিষেধ বহাল রাখার যথাযথ আইনগত ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া।

সংগঠনটি আরও উল্লেখ করেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযুক্তদেরও ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এক পক্ষের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে অন্য পক্ষের ন্যায়বিচারের অধিকার ক্ষুণ্ন করা উচিত নয়।

বিজ্ঞপ্তির শেষাংশে এইচআরডিএস বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও ন্যায়বিচারের কেন্দ্র। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো অভিযোগ উপেক্ষা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগ নিষ্পত্তি না করে কাউকে দীর্ঘদিন অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। সংগঠনটির মতে, অপরাধের বিচার হতে হবে প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে এবং সবার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version