দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ জলসীমায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে কৌশল সাজানোর পরামর্শ পেয়েছে ফিলিপাইন। শুধু চীনা জাহাজের তৎপরতার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করাই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং অনলাইনে অপতথ্য মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে একটি আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক লোয়ি ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে ম্যানিলাকে সামরিক প্রস্তুতি, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
বিতর্কিত জলসীমায় চীনা জাহাজের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
ফিলিপাইনের পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, পালাওয়ান প্রদেশের কাছে ফিলিপাইনের নিয়ন্ত্রণাধীন কোটা দ্বীপের আশপাশে চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার ২২টি নৌযান অবস্থান করছিল। চীনা সামুদ্রিক মিলিশিয়ার ৯৬২২ নম্বর জাহাজটি ২২টি ছোট নৌযান নিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ পর ওই এলাকায় ফিরে আসে।
ফিলিপাইনের অভিযোগ, এসব নৌযান অনুমতি ছাড়া মাছ ধরা এবং সমুদ্রে বর্জ্য ফেলার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।
এর আগে ৮ অক্টোবর আয়ুঙ্গিন শোল এলাকায় ফিলিপাইনের একটি চিকিৎসা ও উদ্ধার অভিযানের সময় চীনা কোস্টগার্ড জলকামান ব্যবহার করে বলে অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ফিলিপাইনের সামরিক সদস্যদের ব্যবহৃত বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজ থেকে একজন সেনাকে সরিয়ে নেওয়া।
স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের বিতর্কিত মিসচিফ রিফ এলাকায় চীনের সামরিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে ১৯৯৯ সালে ফিলিপাইন ইচ্ছাকৃতভাবে বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজটি আয়ুঙ্গিন শোলে স্থাপন করে। এরপর থেকে জাহাজটি ওই অঞ্চলে ফিলিপাইনের উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে রয়েছে।
সমঝোতার পরও বিরোধের অবসান হয়নি
২০২৪ সালে দুই দেশ উত্তেজনা কমানো এবং সংঘাতের ঝুঁকি হ্রাসে একটি অস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু ফিলিপাইনের বক্তব্য, এরপরও বিতর্কিত এলাকায় সেনা পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের সময় বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
ফিলিপাইনের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজে সেনা পরিবর্তন ও রসদ পৌঁছানোর অভিযানে চীনের কোস্টগার্ড এবং নৌবাহিনী বাধা দেয়। এর কয়েক দিন আগে, ১৮ সেপ্টেম্বর জেলেদের কাছে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার সময় চীনা কোস্টগার্ডের একটি জাহাজের ধাক্কায় ফিলিপাইনের সহায়ক নৌযান বিআরপি দাতু মাগাত সালামাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও জানানো হয়।
এদিকে ফিলিপাইনের পর্যবেক্ষণে পাক-আসা দ্বীপ, আয়ুঙ্গিন শোল, এসকোদা শোল ও স্কারবরো শোলের আশপাশে চীনা নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের ১০১টি জাহাজ শনাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্টে একই ধরনের উপস্থিতির সংখ্যা ছিল ৫৬টি।
তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলায়ও প্রস্তুতি প্রয়োজন
সামুদ্রিক এলাকায় জাহাজ মোতায়েনের পাশাপাশি তথ্য ও প্রচারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিকেও ফিলিপাইনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইতিহাসের ব্যাখ্যা, ফিলিপাইনের স্বাধীনতার গুরুত্ব এবং চীনের উন্নয়ন প্রকল্পের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। এ ধরনের প্রচার মোকাবিলায় কেবল সরকারি বিবৃতি প্রকাশ নয়, বরং নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচার শনাক্ত করাও জরুরি।
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সম্মেলনে বলেন, চীনের সঙ্গে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো তাঁর দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে উত্তেজনা এড়িয়ে চলার অর্থ চীনের কাছে নতি স্বীকার করা নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিপাইন সামুদ্রিক এলাকায় চীনের কর্মকাণ্ডের ছবি, ভিডিও ও প্রতিবেদন প্রকাশে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক মহলকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা এবং ২০১৬ সালের সালিশি রায়ের প্রতি সমর্থন ধরে রাখা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি এমন প্রতিরোধব্যবস্থা প্রয়োজন, যার ফলে বিরোধপূর্ণ এলাকায় চাপ প্রয়োগের কৌশল অনুসরণ করা চীনের জন্য আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে নতুন পরিকল্পনা
প্রেসিডেন্ট মার্কোস জুনিয়রের সরকারের ‘কমপ্রিহেনসিভ আর্কিপেলাজিক ডিফেন্স কনসেপ্ট’ বা সমন্বিত দ্বীপপুঞ্জ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক স্থাপনা ছড়িয়ে দেওয়া, দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো, দেশের সমুদ্রসীমা ও দ্বীপাঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সম্ভাব্য সামরিক চাপ মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়ানো।
এ জন্য বিদেশি সামরিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি, সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কোথায় মোতায়েন করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপতথ্য ছড়ানো রোধ এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফিলিপাইনের বিপুলসংখ্যক মানুষ সংবাদ ও তথ্যের জন্য ফেসবুকের ওপর নির্ভর করায় অনলাইন প্রচারের প্রভাব দেশটির নিরাপত্তা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ক্ষেত্রে মিত্র দেশ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আসিয়ানের নেতৃত্ব কাজে লাগাতে চায় ম্যানিলা
চীনের সঙ্গে বিরোধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক কূটনীতিকেও কাজে লাগাতে পারে ফিলিপাইন। ২০২৬ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মিয়ানমারের সংকট, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত বিরোধ এবং দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনার মতো বিষয়গুলোতে আসিয়ানের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। এসব সংকটে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে না পারলে আঞ্চলিক সংগঠনটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
১৯৬৭ সালে আসিয়ান প্রতিষ্ঠার সময় সদস্য দেশগুলোর ঐকমত্য এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব নীতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ফিলিপাইন চাইলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতার কাঠামোকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে পারে।
চীনের মোকাবিলায় একাধিক ফ্রন্টে কাজ করতে হবে
পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা ফিলিপাইনের জন্য সামরিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরার ওপর নির্ভর করলে প্রত্যাশিত ফল নাও আসতে পারে।
বরং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা শক্তিশালী করা, অনলাইনে অপতথ্য মোকাবিলা এবং আসিয়ানের মাধ্যমে আঞ্চলিক সমর্থন জোরদার করার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ফিলিপাইন এসব ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তার ওপরই বিরোধপূর্ণ জলসীমায় দেশটির ভবিষ্যৎ অবস্থান অনেকাংশে নির্ভর করবে।

