অর্থ পাচার ও অবৈধ আর্থিক লেনদেন শনাক্তে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক অব আমেরিকাকে ১২০ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করে। মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, পাঁচশ কোটি ডলারেরও বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য যথাযথভাবে কর্তৃপক্ষকে জানায়নি ব্যাংকটি। এসব লেনদেনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জাতীয় নিরাপত্তা এবং অবৈধ অর্থায়নের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারত।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহজনক লেনদেনগুলোর মধ্যে অন্তত ১০০ কোটি ডলারের আর্থিক কার্যক্রম বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ ছিল। এর মধ্যে চীনা অর্থ পাচারকারী চক্রের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তকেন্দ্রিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের আশঙ্কাও উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে ব্যাংক অব আমেরিকা জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকটি জানিয়েছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক হিসাবে এই জরিমানার অর্থ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর প্রভাবে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি নিট আয় আনুমানিক ১৭ সেন্ট কমতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, এ জরিমানা তাদের ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, বড় কোনো ব্যাংক যখন অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন তার পরিণতি শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এর ফলে গোটা মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় অবৈধ অর্থ প্রবাহের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

মন্ত্রণালয়ের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রম শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ব্যাংকটি নিজস্ব নজরদারি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছে। ফলে সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার দায়িত্বের একটি বড় অংশ অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী, ব্যাংক অব আমেরিকা স্বীকার করেছে যে অর্থ পাচার প্রতিরোধে কার্যকর কর্মসূচি বজায় রাখা, বিদেশি সহযোগী ব্যাংকগুলোর হিসাব যথাযথভাবে যাচাই করা এবং সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতা ছিল। এসব ব্যর্থতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছাকৃতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক সিক্রেসি অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে বলে সমঝোতায় স্বীকার করা হয়েছে।

মোট জরিমানার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় বা ওসিসির আরোপ করা অর্থের পরিমাণ ৭৫ কোটি ডলার। সংস্থাটির ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ জরিমানা। বাকি অর্থের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় বা ওএফএসির সঙ্গে হওয়া সমঝোতার অর্থও রয়েছে।

ওএফএসি জানিয়েছে, রাশিয়া ও ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, মাদকসংক্রান্ত কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় জারি করা বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য ৪৭৫টি লঙ্ঘনের বিষয় ব্যাংকটির ঘটনায় উঠে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব লঙ্ঘনকে গুরুতর পর্যায়ের হিসেবে বিবেচনা না করায় এ বিষয়ে সমঝোতার অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলার।

এই ঘটনা আবারও যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাতে অর্থ পাচার প্রতিরোধ, সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার গুরুত্ব সামনে নিয়ে এসেছে। বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা থাকলে তা কীভাবে জাতীয় নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, ব্যাংক অব আমেরিকার বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপ সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version