বলিউডের শাহেনশাহ অমিতাভ বচ্চনের জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে কঠিন সংগ্রাম, ভয়াবহ দুর্ঘটনা, বিতর্ক ও ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ গল্প। একসময় শুটিংয়ের সেটে গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছিল তাঁকে। পরবর্তী সময়ে আর্থিক সংকট ও কর্মজীবনের অনিশ্চয়তার মুখেও পড়েন এই অভিনেতা। কিন্তু প্রতিটি প্রতিকূলতা পেরিয়ে আবারও নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন তিনি। আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী তারকা হিসেবে পরিচিত বিগ বি।

১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবর ভারতের প্রয়াগরাজে জন্মগ্রহণ করেন অমিতাভ বচ্চন। তাঁর বাবা বিখ্যাত কবি হরিবংশ রাই বচ্চন এবং মা তেজি বচ্চন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রে তৈরি করেছেন নিজস্ব পরিচয়। তবে ক্যারিয়ারের শুরুতে তাঁর লম্বা গড়ন ও গভীর কণ্ঠস্বর নিয়ে সংশয় ছিল চলচ্চিত্র মহলে। সময়ের সঙ্গে সেই কণ্ঠস্বর ও অভিনয়ের স্বতন্ত্র ধরনই হয়ে ওঠে তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম ভিত্তি।

‘কুলি’র শুটিংয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা

অমিতাভের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ১৯৮২ সালের ২৬ জুলাইয়ের দুর্ঘটনা। বেঙ্গালুরুতে মনমোহন দেশাই পরিচালিত ‘কুলি’ সিনেমার শুটিং চলাকালে সহ-অভিনেতা পুনীত ইসারের সঙ্গে একটি অ্যাকশন দৃশ্য ধারণ করা হচ্ছিল। দৃশ্যটির অংশ হিসেবে একটি টেবিলের ওপর লাফিয়ে পড়ার সময় গুরুতর আঘাত পান অমিতাভ।

দুর্ঘটনায় তাঁর পেটের ভেতরের অংশ, বিশেষ করে অন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পর শুরু হয় চিকিৎসা। পরে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার চলে। সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা প্রিয় অভিনেতার সুস্থতা কামনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন অসংখ্য ভক্ত।

সেই সময় অমিতাভের শারীরিক অবস্থা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল। চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। এই ঘটনা তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে গভীর প্রভাব ফেলে।

বদলে যায় ‘কুলি’ সিনেমার পরিণতি

অমিতাভের দুর্ঘটনা তাঁর অভিনীত ‘কুলি’ ছবির গল্পের সমাপ্তিতেও প্রভাব ফেলেছিল। সিনেমাটির চিত্রনাট্য অনুযায়ী, শেষ দিকে তাঁর অভিনীত চরিত্রটির মৃত্যুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবে অভিনেতার জীবন নিয়ে দর্শকদের উদ্বেগ এবং চরিত্রটির পরিণতি নিয়ে আবেগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ছবির শেষাংশ পরিবর্তন করা হয় বলে জানা যায়।

১৯৮৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কুলি’ বক্স অফিসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে ফিরে আসার পর অমিতাভের প্রতি দর্শকদের আবেগ আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

দুর্ঘটনার পরও রয়ে যায় স্বাস্থ্যঝুঁকি

শুটিংয়ের সেই দুর্ঘটনার প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর জীবনে ছিল। পরবর্তী সময়ে অমিতাভ নিজেই হেপাটাইটিস-বি সংক্রমণ নিয়ে কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর রক্ত সঞ্চালনের সময় সংক্রমিত রক্তের মাধ্যমে তাঁর শরীরে ভাইরাসটি প্রবেশ করেছিল।

২০০০ সালে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় সংক্রমণের বিষয়টি শনাক্ত হয় বলে তিনি জানিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে নিজের যকৃতের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও প্রকাশ্যে উল্লেখ করেন এই অভিনেতা। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসংকটের মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘটনা তাঁর জীবনের অন্যতম আলোচিত দিক।

রাজনীতিতে যোগদান ও বফর্স বিতর্ক

অমিতাভ বচ্চনের জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রাজনীতি। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে ১৯৮৪ সালে কংগ্রেসে যোগ দেন তিনি। এলাহাবাদ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হন।

তবে রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৮৭ সালে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে দেন তিনি। এর পরবর্তী সময়ে বফর্স কামান কেনা নিয়ে দুর্নীতির বিতর্কে তাঁর ও পরিবারের নাম আলোচনায় আসে। রাজীব গান্ধীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।

বিতর্কের ফলে অমিতাভকে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। তবে অভিযোগ ওঠা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়—এই পার্থক্য বিবেচনায় রাখা জরুরি।

আর্থিক সংকট থেকে টেলিভিশনে নতুন যাত্রা

চলচ্চিত্রজীবনের একপর্যায়ে আর্থিক চাপ ও কাজের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন অমিতাভ। সেই কঠিন সময়েই তাঁর সামনে আসে টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ সঞ্চালনার সুযোগ।

২০০০ সালে অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক হিসেবে নতুন যাত্রা শুরু করেন তিনি। তখন বড় পর্দার একজন সুপারস্টারের টেলিভিশনে আসা নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। কিন্তু অমিতাভের সাবলীল উপস্থাপনা, প্রতিযোগীদের সঙ্গে আন্তরিক আচরণ এবং স্বাভাবিক রসবোধ দ্রুত দর্শকদের মন জয় করে নেয়।

এই অনুষ্ঠান তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন গতি এনে দেয়। যাঁকে এত দিন দর্শকেরা মূলত সিনেমার পর্দায় দেখেছেন, তিনি ধীরে ধীরে ঘরের পরিচিত মুখে পরিণত হন। চলচ্চিত্রের বাইরেও যে জনপ্রিয়তা ধরে রাখা সম্ভব, তা নতুন করে প্রমাণ করেন অমিতাভ।

‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ থেকে বহুমাত্রিক অভিনেতা

১৯৬৯ সালে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন অমিতাভ বচ্চন। ‘জঞ্জির’, ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’ ও ‘ডন’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের কারণে পরিচিতি পান ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ হিসেবে।

পরবর্তী সময়ে নিজের অভিনয়ের পরিসর আরও বিস্তৃত করেন তিনি। ‘বাগবান’, ‘ব্ল্যাক’, ‘সরকার’, ‘চিনি কম’, ‘পা’ এবং ‘পিকু’র মতো ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে দেখিয়েছেন, বয়স বাড়লেও অভিনয়ের শক্তি ও বৈচিত্র্য ধরে রাখা সম্ভব।

অ্যাকশনধর্মী চরিত্রের পাশাপাশি আবেগনির্ভর, জটিল ও পরিণত চরিত্রেও তাঁর দক্ষতা তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে একাধিক প্রজন্মের দর্শকের কাছে জনপ্রিয় থাকার পেছনে এই বৈচিত্র্যের বড় ভূমিকা রয়েছে।

বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর নাম অমিতাভ বচ্চন

মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই, স্বাস্থ্যগত জটিলতা, রাজনৈতিক বিতর্ক কিংবা কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা—অমিতাভ বচ্চনের পথ কখনোই বাধাহীন ছিল না। কিন্তু প্রতিটি সংকটের পর নতুনভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন তিনি।

তাঁর জীবনকাহিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র তারকার সাফল্যের গল্প নয়; বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেকে বদলে নেওয়া এবং নতুন সুযোগ কাজে লাগানোর উদাহরণ। সেই কারণেই কয়েক দশক পেরিয়েও ভারতীয় বিনোদনজগতে অমিতাভ বচ্চনের অবস্থান এতটা গুরুত্বপূর্ণ।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version