ভারতীয় নারী ক্রিকেটে এলো বড় পরিবর্তন। সব ফরম্যাটের অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন হারমানপ্রীত কৌর। দীর্ঘদিন ভারতের নারী ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পর এবার অধিনায়কত্বের দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছেন তিনি। তবে ক্রিকেটার হিসেবে খেলা চালিয়ে যাবেন হারমানপ্রীত।
তার নেতৃত্বের অধ্যায়টি ভারতের নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় হিসেবে বিবেচিত হবে। এই সময়ে ভারতীয় দল বড় কিছু সাফল্য পেয়েছে। ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয় এবং এশিয়ান গেমসে স্বর্ণপদক অর্জনের মতো সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হারমানপ্রীতের নেতৃত্বের সময়কাল।
এখন স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে নতুন অধিনায়কের প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে দলের সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করা স্মৃতি মান্ধানা নেতৃত্বের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে ক্রিকেটমহলে আলোচনা চলছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন অধিনায়কের নাম এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
হারমানপ্রীতের নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন ভারতীয় নারী দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। গুয়াহাটিতে বিসিসিআইয়ের একটি পর্যালোচনা বৈঠকের পরই তার সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে আসে। বৈঠকে সাম্প্রতিক সময়ের পারফরম্যান্স, দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সামনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে হারমানপ্রীত কৌর, সহ-অধিনায়ক স্মৃতি মান্ধানা এবং প্রধান কোচ অমল মজুমদার উপস্থিত ছিলেন। তবে বৈঠকে হারমানপ্রীতকে নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে কোনোভাবে চাপ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
এর মধ্যেই নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ বার্তায় সিদ্ধান্তের কথা জানান হারমানপ্রীত। সেখানে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, দীর্ঘ ও আবেগঘন একটি অধ্যায়ের পর এবার নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
২০১৬ সালে প্রথমবার নিয়মিতভাবে ভারতীয় নারী দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান হারমানপ্রীত। এর আগে অবশ্য সাময়িকভাবে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাও ছিল তার। এরপর বছরের পর বছর অধিনায়ক হিসেবে দলের সঙ্গে ছিলেন তিনি।
নেতৃত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিতে গিয়ে হারমানপ্রীত জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি, সাফল্য, ব্যর্থতা, চাপ এবং ব্যক্তিগত ত্যাগ—সবকিছুর সঙ্গে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব জড়িয়ে ছিল। জাতীয় দলের জন্য নিজের সময়, শ্রম ও শক্তি উজাড় করে দেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
হারমানপ্রীতের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে অধিনায়কত্বের কঠিন বাস্তবতা। একজন অধিনায়ককে অনেক সময় এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা সবাই সহজভাবে গ্রহণ করেন না। দলের স্বার্থে কখনো ব্যক্তিগত পছন্দ বা নিজের প্রত্যাশাকেও পেছনে রাখতে হয়। হারমানপ্রীতের দাবি, অধিনায়ক হিসেবে তার নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য ছিল দলকে এগিয়ে নেওয়া এবং সতীর্থদের নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
তার নেতৃত্বের সময় যেমন সাফল্য এসেছে, তেমনি এসেছে কঠিন সময়ও। ব্যর্থতা, সমালোচনা, প্রশ্ন এবং হতাশার মধ্য দিয়েও তাকে এগোতে হয়েছে। আবার গুরুত্বপূর্ণ জয় এবং দেশের হয়ে বড় অর্জনের আনন্দও পেয়েছেন তিনি।
বিশেষ করে হারমানপ্রীতের অধিনায়কত্ব নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটমহলে আলোচনা কম ছিল না। দলের কৌশলগত সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে মাঠে তার নেতৃত্ব এবং ব্যাট হাতে পারফরম্যান্স—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ ছিল। অনেকে মনে করছিলেন, ভারতীয় নারী ক্রিকেটে নতুন নেতৃত্বের সময় এসেছে এবং স্মৃতি মান্ধানাকে সেই দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
তবে এসব বিতর্কের মধ্যেও হারমানপ্রীত নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দলের ভালোর কথা মাথায় রেখেই অধিনায়ক হিসেবে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই সিদ্ধান্ত সবসময় জনপ্রিয় হবে—এমনটা তিনি প্রত্যাশা করেননি।
এখন নেতৃত্বের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ফলে হারমানপ্রীতের ওপর থেকে অধিনায়কত্বের কৌশলগত চাপ অনেকটাই কমবে। তিনি নিজের ব্যাটিং এবং ক্রিকেটীয় পারফরম্যান্সে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন। সামনে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থাকায় এটি তার জন্য নতুনভাবে নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগও তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে ভারতীয় দলের জন্যও শুরু হতে যাচ্ছে নতুন একটি অধ্যায়। নতুন অধিনায়ক দায়িত্ব নিলে দলের কৌশল, নেতৃত্বের ধরন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে স্মৃতি মান্ধানা যদি দায়িত্ব পান, তাহলে তার নেতৃত্বে দল কীভাবে এগোয়, সেটিই হবে এখন বড় আগ্রহের বিষয়।
তবে হারমানপ্রীতের ক্রিকেটযাত্রা এখানেই শেষ হচ্ছে না। তিনি স্পষ্ট করেছেন, অধিনায়কত্ব ছাড়লেও ভারতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন। অর্থাৎ মাঠে তাকে আবারও দেখা যাবে, শুধু এবার অধিনায়কের আর্মব্যান্ড ছাড়াই।
হারমানপ্রীতের বিদায়ী বার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি নেতৃত্বের অধ্যায়কে শেষ হিসেবে দেখছেন না, বরং নতুন একটি পর্বের সূচনা হিসেবে দেখছেন। বহু বছর অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার ক্রিকেটার হিসেবে নিজের খেলায় মনোযোগ দেওয়ার পালা।
ভারতীয় নারী ক্রিকেটে তার নেতৃত্বের সময় নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বিশ্লেষণ হবে। সাফল্য, বিতর্ক, কঠিন সিদ্ধান্ত এবং বড় ম্যাচের স্মৃতি—সব মিলিয়ে হারমানপ্রীতের অধিনায়কত্বের অধ্যায়টি যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাতে সন্দেহ নেই।
এখন অপেক্ষা নতুন অধিনায়কের নাম ঘোষণার। স্মৃতি মান্ধানা কি সত্যিই নেতৃত্বের দায়িত্ব পাবেন, নাকি বিসিসিআই অন্য কোনো পরিকল্পনা করছে—সেটিই সামনে বড় প্রশ্ন। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, হারমানপ্রীত কৌরের অধিনায়কত্বের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে। আর শুরু হচ্ছে ভারতীয় নারী ক্রিকেটে নতুন নেতৃত্বের সম্ভাব্য এক নতুন যুগ।
