স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পরও দেশটির পাশে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ করা সম্ভব কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার।

রোববার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের একটি অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।

মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশকে এখন শুধু সহায়তা পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে—এমন একটি দেশ হিসেবে দেখছে না ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বরং দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি এবং পারস্পরিক সুবিধাজনক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দিকে এগোনোর আগে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বার্থের মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, সম্ভাব্য এ ধরনের চুক্তিতে উভয় পক্ষের ব্যবসায়ীদের জন্য সমান ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ থাকা প্রয়োজন।

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন ইইউ রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক বিভাজন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ, মানবাধিকার এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের ভূকৌশলগত গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন মাইকেল মিলার। তার মতে, দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিও দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

সম্ভাব্য এফটিএ বাস্তবায়নে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। আইনের শাসন, শ্রমিকের অধিকার, মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সুশাসনের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রদূত।

তার মতে, স্বাধীন ও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে থাকা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন মাইকেল মিলার। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, সবুজ অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়া, রপ্তানির জন্য নতুন বাজার তৈরি এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিত করাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হলে দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর আগ্রহের কথাও জানান ইইউ রাষ্ট্রদূত। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, উন্নত মানদণ্ড, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ইউরোপের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি। জনশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কাজে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেন মাইকেল মিলার।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও রপ্তানি খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেওয়া ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ বা ইবিএ বাণিজ্য সুবিধার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, এই সুবিধা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এখন দুই পক্ষের সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে ‘নতুন করে গড়ে ওঠা এক বিশ্বে ক্ষমতা, প্রযুক্তি ও আস্থার পথচলা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে।

শনিবার সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, তিন দিনের এই সম্মেলনে শতাধিক দেশের প্রায় ২০০ জন বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী অংশ নিচ্ছেন।

আয়োজনে সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, গবেষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উদ্ভাবক এবং তরুণ নেতৃত্বসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।

সোমবার তিন দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপ্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version