ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে ৪৭৪টি সামরিক অভিযান চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের সেনাবাহিনী। তাদের দাবি, এসব অভিযানে হুথি বাহিনীর ১ হাজার ৫৪০ সদস্য নিহত অথবা আহত হয়েছেন।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আব্দুল্লাহ আল-নাজিলি এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানান। তাঁর দাবি অনুযায়ী, হুথিদের অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা, রসদ ও অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের জায়গাগুলোকে এসব অভিযানের লক্ষ্য করা হয়। তবে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের পাশাপাশি আর্টিলারি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় হারাদ ও উপকূলীয় এলাকা থেকে শুরু করে কিতাফ, আল-জাওফ, মারিব, আল-বায়দা, লাহজ, সানা ও সাদা—বিভিন্ন রণাঙ্গনে এসব অভিযান পরিচালিত হয়।

তবে সামরিক অভিযানের মূল গুরুত্ব ছিল তাইজের বিভিন্ন ফ্রন্টে। ইয়েমেনি বাহিনীর দাবি, সেখানে হুথিদের সমাবেশস্থল, নতুন করে আসা সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আরও দাবি করেন, ২৪ ঘণ্টার অভিযানে হুথিদের ১ হাজার ৫৪০ সদস্য নিহত বা আহত হয়েছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ তাইজের বিভিন্ন রণাঙ্গনের। একই সময়ে ২১৬টি সামরিক যান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

সরকারি বাহিনীর ভাষ্য, এসব অভিযানের কারণে তাইজ এলাকায় হুথিদের স্থল অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সেনাবাহিনী দাবি করেছে, ওই এলাকায় হুথিরা বড় ধরনের সামরিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। তবে এসব দাবির বিপরীতে হুথিদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এর আগেও তাইজকে কেন্দ্র করে একাধিক সামরিক অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। শুক্রবারের আগের এক ঘোষণায় তারা জানিয়েছিল, তাইজে হুথিদের অবস্থান ও রসদ সরবরাহের গতিবিধি লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান দিয়ে ২০টি হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে সানা ও সাদায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথাও জানানো হয়।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘর্ষের মাত্রা বাড়ছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইয়েমেনি সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, ২৪ ঘণ্টায় ৩৫৬টি অভিযান চালিয়ে ৪৭৬ হুথি সদস্য নিহত বা আহত হয়েছে বলে তাদের দাবি। এর পরদিন আরও ৪১৪টি হামলার কথা জানায় সরকারি বাহিনী।

তাই সাম্প্রতিক ৪৭৪টি হামলার দাবি ইয়েমেনে চলমান সামরিক উত্তেজনার ধারাবাহিকতারই অংশ। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে সংঘাত কম থাকলেও ২০২৬ সালে বিভিন্ন ফ্রন্টে আবারও লড়াই জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে তাইজ ও দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ইয়েমেনের বর্তমান সংঘাতের শিকড় আরও পুরোনো। ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা এবং দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক সংকট বড় ধরনের যুদ্ধে রূপ নেয়। পরের বছর ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে।

বর্তমানে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে লড়াই চলতে থাকায় দেশটির সামরিক পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তাইজসহ গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গনগুলোতে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ৪৭৪ হামলা, ১ হাজার ৫৪০ হতাহত এবং ২১৬টি সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যগুলো এখন পর্যন্ত মূলত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর দেওয়া হিসাবের ওপর নির্ভরশীল।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version