একদিকে বাড়ছে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ, অন্যদিকে সেই তুলনায় আয় বাড়ছে না। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, নিত্যপণ্যের মূল্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ—সব মিলিয়ে বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে সাধারণ মানুষের পরিবারগুলো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ বিলের বাড়তি চাপ, গ্যাসের সংকট এবং কর্মসংস্থানের দুর্বল পরিস্থিতি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষি, শিল্প, পণ্য পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এর পরপরই পরিবহন খরচ ও বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। সীমিত আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

গ্যাস সংকটে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন চালু রাখতে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেক কারখানাকে। কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস সংগ্রহ করে তা কারখানায় ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবে গ্যাস সংগ্রহের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহের সংকট দীর্ঘায়িত হলে ছোট ও মাঝারি উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব কর্মসংস্থানেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়তেই পরিবহনে বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর দাবি নতুন করে সামনে এসেছে। সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভাড়া সমন্বয় না হলেও রাজধানীর কিছু রুটে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার থেকে মিরপুর-১০ রুটে চলাচলকারী একটি বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে আগের তুলনায় ১০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে উত্তরা আব্দুল্লাহপুর রুটে চলাচলকারী একটি এসি বাসে বিভিন্ন গন্তব্যে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাড়ায় পরিবহন খাতেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

বাজারে বাড়ছে পণ্যের দাম

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে কয়েক টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক সবজিই এখন ৮০ টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কিছু পণ্যের দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে।

এদিকে জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব দেখিয়ে ভোজ্য তেলের বাজারেও দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর একটি বড় অংশ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে।

বিনিয়োগ কমায় কর্মসংস্থানেও চাপ

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ দুর্বল থাকায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমে গেছে। একই সঙ্গে কিছু প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান কর্মী ধরে রাখতেও সমস্যায় পড়ছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে। আমদানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ বাড়লে ব্যবসার সামগ্রিক পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। এতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তেও প্রভাব পড়তে পারে।

কৃষিতেও বাড়ছে খরচ

ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব কৃষি খাতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেচ পাম্প পরিচালনা, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন কৃষি কার্যক্রমে ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে।

এ ছাড়া জেনারেটরনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বাড়তে পারে। ফলে কৃষি উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেলে ভবিষ্যতে বাজারদরেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বাড়তে পারে ব্যয়

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অংশ তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিজেলের ব্যবহার অর্থনীতির বহু খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কৃষি, গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন ও বিভিন্ন উৎপাদন কার্যক্রমে ডিজেলের ব্যবহার থাকায় এর দাম বাড়লে একাধিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসার খরচেও বাড়তি চাপ

চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ পরিবারের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বড় একটি উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন।

অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ মেটাতে ঋণ নেয় বা সঞ্চয় ভেঙে ফেলে। কারও কারও ক্ষেত্রে সম্পদ বিক্রি করার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়। ফলে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।

শিক্ষার খরচও বাড়ছে

সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় সামলাতেও হিমশিম খাচ্ছেন অনেক অভিভাবক। স্কুলের বেতন, বই-খাতা, কোচিং, প্রাইভেট পড়ানো এবং যাতায়াত—সব মিলিয়ে শিক্ষার পেছনে পরিবারের মাসিক ব্যয় বেড়েছে।

বিশেষ করে নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এই বাড়তি ব্যয় বড় চাপ তৈরি করছে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কিছু পরিবার সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়ছে।

বেসরকারি চাকরিজীবীদের ওপরও চাপ

বাসাভাড়া, যাতায়াত, খাবার, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বাড়লেও অনেক বেসরকারি চাকরিজীবীর আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে মাসের খরচ মেটাতে অনেকে সঞ্চয় ব্যবহার করছেন, আবার কেউ কেউ ধারদেনার ওপর নির্ভর করছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়লে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হয়।

সরকারি বেতন বাড়লেও বাজারে প্রভাবের আশঙ্কা

এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ধাপে ধাপে বাড়তি মূল বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি কর্মীদের আয় বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে একই সময়ে বাজারে পণ্য ও সেবার দাম বাড়লে বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতেই চলে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের বাজার, পরিবহন ব্যয়, চিকিৎসা ও শিক্ষা খরচ এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা—এই কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে সাধারণ পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। আয় বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক পরিবারের জন্য মাসিক ব্যয় সামলানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version