ইরিত্রিয়ার ওপর আরোপ করা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। লোহিত সাগর ও এর আশপাশের অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যখন ক্রমেই বাড়ছে, ঠিক সেই সময়ে ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্ত সামনে এলো। এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম দ্য মিডল ইস্ট আই।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, ইরিত্রিয়ার ক্ষমতাসীন দল পিপলস ফ্রন্ট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড জাস্টিস (পিএফডিজে), দেশটির সামরিক বাহিনী এবং রেড সি ট্রেডিং করপোরেশনের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা হয়েছে। ইরিত্রিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ারকির ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হাগোস গেব্রেহিওয়েতের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

২০২১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইরিত্রিয়ার বিরুদ্ধে এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এর পেছনে ইথিওপিয়ার টাইগ্রে অঞ্চলের সংঘাতে ইরিত্রিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই সংঘাতে ইরিত্রিয়ার সেনারা ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে লড়াই করেছিল।

আফ্রিকান ইউনিয়নের হিসাব অনুযায়ী, টাইগ্রে সংঘাতে প্রায় ৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। সংঘাতের সময় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও সামনে এসেছিল।

১৯৯৩ সালে ইথিওপিয়া থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে ইরিত্রিয়ার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ারকি। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় ইরিত্রিয়া ও ইথিওপিয়া সাময়িকভাবে একই পক্ষের অবস্থানে থাকলেও পরবর্তীতে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বর্তমানে বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে আদ্দিস আবাবা ও আসমারার মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে।

এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইথিওপিয়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সুদানের গৃহযুদ্ধে ইউএই-সমর্থিত র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে সহায়তা করছে ইথিওপিয়া। দেশটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরবরাহ করা ড্রোনসহ বিভিন্ন অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে বলেও এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে সুদানের সেনাবাহিনীর প্রতি সমর্থন রয়েছে ইরিত্রিয়ার। একই অবস্থানে রয়েছে মিসর, তুরস্ক ও সৌদি আরবও।

একসময় ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর আসাবে ইউএইর একটি সামরিক ঘাঁটিও ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।

ইরিত্রিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওসমান সালেহ অভিযোগ করেছেন, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ইউএই ‘বন্দর সাম্রাজ্যবাদ’ বিস্তারের নীতি অনুসরণ করছে। তার দাবি, ইসরাইলের সঙ্গে সমন্বয় করে লোহিত সাগরে একটি নৌঘাঁটি স্থাপনের চেষ্টা করছে দেশটি।

ভূকৌশলগত দিক থেকে ইরিত্রিয়ার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির লোহিত সাগর উপকূলের দৈর্ঘ্য এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। জিবুতি, ইরিত্রিয়া ও ইয়েমেনের জলসীমার মধ্যবর্তী বাব আল-মান্দেব প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে পরিচিত।

ইয়েমেনের হুথি বাহিনীও লোহিত সাগরের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করে আসছে। একই সঙ্গে তাইজ ও মারিব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সেখানে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।

ইরিত্রিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওসমান সালেহের মতে, ইয়েমেন সংকটের সামরিক সমাধান সম্ভব নয়। তিনি দেশটির জন্য রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

লোহিত সাগরে অবাধ নৌ চলাচল কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত উপকূলীয় দেশগুলোরই নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে ইয়েমেনে একটি ঐক্যবদ্ধ সরকার না থাকায় এই সংকটের সমাধান আরও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version