বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন অবস্থান নিয়ে দলটির ভেতরেই বহু বছর ধরে আলোচনা হয়েছে। সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর প্রকাশিত স্মৃতিকথা Bangladesh Jamaat-e-Islami: Its History and Politics-এ দাবি করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার জন্য দলটির ভেতরে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় পরিণত হয়নি।
রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, এ বিষয়ে প্রথম বড় উদ্যোগ দেখা যায় ১৯৯৪ সালে। সে সময় গোলাম আযমের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পুনর্বহালের পর তার একটি বক্তব্যের প্রস্তুতি নিয়ে দলটির মধ্যে আলোচনা হয়। রাজ্জাকের পক্ষ থেকে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত গোলাম আযমের বক্তব্যে সরাসরি দলীয় অবস্থানের বিস্তারিত ব্যাখ্যার বদলে অতীতে কোনো ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলা হয়। রাজ্জাক তাঁর স্মৃতিকথায় এই বক্তব্যকে যথেষ্ট নয় বলে বর্ণনা করেছেন।
২০০১ সালের পর আবারও উদ্যোগ
দ্বিতীয় বড় উদ্যোগের সময় আসে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের সাফল্যের পর। রাজ্জাক মনে করেছিলেন, তখনকার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দলটি ১৯৭১ সালের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার করতে পারে।
তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপকের সহযোগিতায় একটি বিবৃতির খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে দলীয় নেতাদের নিয়ে একাধিক বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক দফা সংশোধনের পর একটি খসড়ায় ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল এবং বিজয় দিবসের আগে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সেটি প্রকাশের পরিকল্পনাও করা হয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যায়ে জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী অবস্থান পরিবর্তন করেন বলে রাজ্জাক তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন। কেন এই পরিবর্তন হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেননি।
২০০৫ সালে প্রস্তাব গেল ওয়ার্কিং কমিটিতে
বিষয়টি পরে জামায়াতের ওয়ার্কিং কমিটিতেও ওঠে। ২০০৫ সালের অক্টোবরে প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হয়। রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, সেখানে প্রস্তাবটি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রত্যাখ্যাত হয়।
বিরোধীদের যুক্তির মধ্যে ছিল—একীভূত পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে ভুল হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। ভারতের প্রভাব নিয়ে আশঙ্কার কথাও তখন আলোচনায় আসে। আবার কেউ কেউ মনে করেছিলেন, ক্ষমা চাইলেও রাজনৈতিক বিরোধীরা বিষয়টি গ্রহণ করবে না।
এরপরও ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে ১৯৭১ সালের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে রাজ্জাক লিখেছেন। কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
২০১১ সালেও আলোচনা, কিন্তু সিদ্ধান্ত হয়নি
রাজ্জাকের বর্ণনায়, ২০১১ সালের মজলিশে শুরার উন্মুক্ত অধিবেশনেও তিনি বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বিশেষ করে তরুণ নেতাদের এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তবে সেবারও দলীয়ভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমা বা অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা আসেনি।
২০১৬ সালে তৈরি হয়েছিল আরও একটি খসড়া
২০১৬ সালে কয়েকজন শীর্ষ জামায়াত নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। নতুন নেতৃত্বের সময় আবারও ১৯৭১ সালের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
রাজ্জাকের বই অনুযায়ী, তখন তাঁকে একটি ক্ষমাপ্রার্থনার খসড়া প্রস্তুত করতে বলা হয়। ২১ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে তিনি দলীয় আমিরকে একটি চিঠির সঙ্গে সেই খসড়া দেন।
প্রস্তাবিত বিবৃতিতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য দুঃখ প্রকাশ এবং জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের বিরোধিতা না করার জন্যও অনুতাপ প্রকাশের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। তবে খসড়াটি শেষ পর্যন্ত দলীয় আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় রূপ নেয়নি।
২০১৮-১৯ সালে আবারও অবস্থান বদলের চেষ্টা
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর জামায়াতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে চাপ তৈরি হলে দলটির নির্বাহী কমিটিতে ১৯৭১ সালের বিষয়টি সমাধানের পাশাপাশি দল বিলুপ্ত করে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ও আলোচিত হয়েছিল বলে রাজ্জাক তাঁর স্মৃতিকথায় দাবি করেছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুর দিকে শুরা সদস্যদের একটি বড় অংশ দল পুনর্গঠনের পক্ষে ছিলেন এবং একটি অংশ ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে মত দেন। কিন্তু পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা কমে গেলে দলীয় অবস্থানে আবার পরিবর্তন আসে। ক্ষমা চাওয়া ও দল বিলুপ্ত—দুই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত পরিত্যক্ত হয়। এরপর ২০১৯ সালে রাজ্জাক জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন।
কেন বারবার থেমে গেল উদ্যোগ?
আবদুর রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতিটি পর্যায়েই দলটির নেতৃত্বের ভেতরে ১৯৭১ সালের অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য ছিল। একদিকে একটি অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে অতীতের রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য দুঃখ প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা দেখেছিল। অন্যদিকে প্রভাবশালী অংশের আপত্তির কারণে উদ্যোগগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
রাজ্জাক তাঁর বইয়ে লিখেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক খসড়া তৈরি হলেও কোনোটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। তাঁর মতে, ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়া দলটির জন্য দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে রয়েছে।
তবে এসব বিবরণ মূলত আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় দেওয়া তাঁর নিজস্ব বর্ণনা ও মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে। ফলে দলীয় অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের পেছনে কার কী ভূমিকা ছিল—এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যকে সেই সূত্রের প্রেক্ষিতেই দেখা প্রয়োজন।
