গাজায় যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবনধসে নিহত ১২, ধ্বংসস্তূপে শতাধিক আটকা পড়ার আশঙ্কা
গাজা শহরে বোমা হামলায় আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত একটি সাততলা ভবন রাতের মধ্যে ধসে পড়ে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচটি শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও প্রায় ১০০ মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার সকালে ধসে পড়া ভবনের কাছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনায় আরও ১৪ জন আহত হয়েছেন। ধসের আগে ভবনটিতে অন্তত ১০টি পরিবার বসবাস করছিল। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। রয়টার্সের হাতে আসা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, উদ্ধারকারীরা ভেঙে পড়া দেয়ালের নিচ থেকে দুজনকে বের করার চেষ্টা করছেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুখপাত্র মাহমুদ বাসালকে একটি ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। শিশুটির শরীরে রক্তমাখা একটি স্কার্ফ ছিল।
গাজা শহরের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের পরিচালক রায়েদ আল-দাহশানের ভাষ্য অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখনও মানুষের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন উদ্ধারকারীরা। তিনি জানান, অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় ভবনটি ধসে পড়ায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।
উদ্ধার তৎপরতায় জাতিসংঘের কয়েকটি সংস্থার কর্মীরাও যুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির গাজা কার্যালয়ের প্রধান আলেসান্দ্রো ম্রাকিচ। তবে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। মিসরের ত্রাণ সংস্থার কর্মীরাও এই কাজে সহযোগিতা করছেন।
ম্রাকিচ জানান, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে উদ্ধারকারীদের অনেক ক্ষেত্রেই খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরাতে হচ্ছে। এতে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে দেরি হওয়ার পাশাপাশি আরও প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ৪০০টি ভবন বর্তমানে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সামনে শীতকাল শুরু হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
গাজায় ভারী উদ্ধার সরঞ্জামের সংকটের জন্য ফিলিস্তিনি ও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা ইসরায়েলের আরোপিত বিধিনিষেধকে দায়ী করেছেন। তাদের অভিযোগ, ধ্বংসস্তূপ সরানো এবং আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব সরঞ্জাম যেন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে না পৌঁছায়, সে কারণেই এ ধরনের বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কারণে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ ও আবর্জনা জমেছে। এই বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ সরাতে সাত বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে।
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী আরও জানিয়েছে, প্রায় ২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে এখনও পরিবার বসবাস করছে। এসব ভবন থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন রায়েদ আল-দাহশান। তার সতর্কতা, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি হলো, গাজায় নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনেই ফিরে যাচ্ছে। দাহশানের মতে, অনেক বাসিন্দা ভবনগুলোকে এখনও বসবাসের উপযোগী মনে করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘুমের মধ্যেই ভবন ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
গত কয়েক মাসে গাজার বহু পরিবার রয়টার্সকে জানিয়েছে, ঝড়, বৃষ্টি ও তীব্র বাতাস থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তারা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছে। গৃহহীন মানুষের জন্য নতুন তাঁবুর সংকটও তাদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে থাকার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে গাজায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর পর বড় আকারের সংঘর্ষ কিছুটা কমলেও ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। একই সঙ্গে স্থায়ী শান্তির ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
হামাস ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে। পাশাপাশি তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা সংঘাত বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে। ওই পরিকল্পনায় গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হামাসকে নিরস্ত্র করার বিষয় রয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি, যুদ্ধবিরতি চুক্তি হামাসই লঙ্ঘন করছে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা
