ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে ডাকসুর চালু করা অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে শিক্ষকসমাজে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শিক্ষক মনে করছেন, এমন উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে হওয়া উচিত ছিল; ছাত্রসংসদের পক্ষ থেকে এটি পরিচালনা করা সমীচীন নয়।

গত ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করে। উদ্বোধনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই হাজারো শিক্ষার্থী সেখানে বিভিন্ন শিক্ষকের বিষয়ে মতামত ও মূল্যায়ন জমা দেন। পরবর্তীতে শিক্ষকদের প্রাপ্ত স্কোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে কয়েকজন শিক্ষক বিদ্রূপ ও নেতিবাচক মন্তব্যের মুখে পড়েন।

শিক্ষকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, এ ধরনের মূল্যায়ন ব্যবস্থা পরিচালনার এখতিয়ার ডাকসুর নেই। পাশাপাশি মূল্যায়নের ফলাফল গোপন রাখতে ব্যর্থ হওয়াও গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাঁদের মতে, কোনো শিক্ষক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার জন্য নির্ধারিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু প্রকাশ্যে হেয়প্রতিপন্ন করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

মূল্যায়ন পদ্ধতির স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচনা বাড়তে থাকায় রোববার শিক্ষকদের প্রাপ্ত নম্বর সাধারণের দেখার সুযোগ বন্ধ করে দেয় ডাকসু। তবে এর আগেই ফলাফল বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের মতো বিষয় অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর মতে, একজন শিক্ষকের কাজ কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়; গবেষণা, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমও তাঁর দায়িত্বের অংশ। ফলে শুধু শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষকের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগের সংখ্যা ছিল ৪৭, যা বর্তমানে বেড়ে ৮৪-এ পৌঁছেছে। একই সময়ে ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ৯ থেকে বেড়ে ১২ হয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে ২২ হাজার থেকে ৩৭ হাজারের বেশি এবং শিক্ষকসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২ হাজারের বেশি হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকের পাঠদানের মান, গবেষণায় অংশগ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে অভিযোগ ছিল। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করে, তাদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই মেয়াদের শেষ পর্যায়ে ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version