শিশুসাহিত্যের জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান আমীরুল ইসলাম আর নেই। কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতায় গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
১১ সেপ্টেম্বর রাত ১টা ৭ মিনিটে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন প্রকাশক মঈন মুরসালিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি আমীরুল ইসলামের মৃত্যুর সংবাদ জানান।
আমীরুল ইসলামের মৃত্যুতে সাহিত্য ও গণমাধ্যম অঙ্গনে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য তার দীর্ঘদিনের সাহিত্যচর্চা বাংলা শিশুসাহিত্যে তাকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে দিয়েছিল।
মৃত্যুর পর তাকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানানোর জন্য একাধিক স্থানে জানাজার আয়োজন করা হয়েছে।
জানা গেছে, তার কর্মস্থল চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এরপর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বিকেল ৩টায় মরদেহ নেওয়া হয় বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে। সেখানে বিকেল সাড়ে ৩টায় দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানানো হয়।
এরপর তার মরদেহ নেওয়া হবে মিরপুরের গোলারটেক ঈদগাহ জামে মসজিদে। সেখানে তৃতীয় জানাজা শেষে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে। মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে।
১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকার লালবাগে জন্মগ্রহণ করেন আমীরুল ইসলাম। শৈশব ও কৈশোর থেকেই সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ থাকলেও পরবর্তী সময়ে শিশুদের জন্য লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তোলেন।
দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি শিশুদের উপযোগী গল্প, ছড়া এবং নানা ধরনের সৃজনশীল লেখা উপহার দিয়েছেন। তার লেখায় শিশুদের কল্পনা, আনন্দ, মানবিক মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতার নানা দিক উঠে এসেছে।
শিশুসাহিত্যে তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। এর বাইরেও সাহিত্যচর্চার জন্য দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।
আমীরুল ইসলামের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দুই শতাধিক বলে জানা যায়। তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মূল ক্ষেত্র ছিল শিশুসাহিত্য। দীর্ঘ সময় ধরে শিশুদের জন্য নিয়মিত লিখে তিনি এই ধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
তবে শুধু লেখালেখির জগতেই তার পরিচয় সীমাবদ্ধ ছিল না। গণমাধ্যমের সঙ্গেও তার দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় তিনি চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সাহিত্য ও গণমাধ্যম—দুই ক্ষেত্রেই তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। একদিকে তিনি শিশুদের জন্য অসংখ্য গল্প ও ছড়া লিখেছেন, অন্যদিকে টেলিভিশন অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
তার মৃত্যুতে শিশুসাহিত্যপ্রেমী পাঠক, লেখক, প্রকাশক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। তার লেখা ও সৃষ্টিশীল কাজের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন, সেটিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাকে স্মরণীয় করে রাখবে।
একজন লেখকের শারীরিক উপস্থিতির সমাপ্তি ঘটলেও তার সৃষ্টিশীলতা থেকে যায় পাঠকের মাঝে। আমীরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। দুই শতাধিক প্রকাশিত গ্রন্থ এবং দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যে নিজের একটি স্থায়ী জায়গা তৈরি করে গেছেন।
তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন, সহকর্মী ও তার অসংখ্য পাঠকের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
