মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। এরই মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সিঙ্গাপুর থেকে বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম ২ দশমিক ০১ ডলার বা ২ দশমিক ০৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৯৩ ডলারে পৌঁছায়। লেনদেনের একপর্যায়ে দাম ১০০ দশমিক ১৯ ডলারেও উঠে যায়। ২৪ জুলাইয়ের পর এটিই ব্রেন্টের সর্বোচ্চ দাম।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও বেড়েছে। এদিন এর দাম ১ দশমিক ৪৯ ডলার বা ১ দশমিক ৬০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৫২ ডলারে দাঁড়ায়।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বাড়ছে উদ্বেগ

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। সংঘাতের একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ দশমিক ৪১ ডলারে উঠেছিল। গত ৩০ এপ্রিল এই দাম রেকর্ড করা হয়।

পরবর্তীতে দাম কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটের স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে তেলের বাজার।

চলতি সপ্তাহে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা, হরমুজ প্রণালির কাছে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা এবং ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় আগুন লাগার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

এসব ঘটনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর দিয়ে জ্বালানি পরিবহনও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

কমছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। সংঘাত শুরুর পর থেকেই এই পথ দিয়ে তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে।

রাইস্টাড এনার্জির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গালিম্বার্থির তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট নতুন করে লড়াই শুরুর আগের সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছিল। আগের সপ্তাহের তুলনায় যা ছিল প্রায় দ্বিগুণ।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে এসেছে বলে তিনি জানান।

তেলের বাজারে ‘নিরাপত্তা প্রিমিয়াম’

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার শুধু সাময়িক মূল্যবৃদ্ধির মুখে নেই; বরং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

অ্যাবাক্স মার্কেটসের সহ-চেয়ারম্যান জেফ্রি কারি মনে করেন, জ্বালানি বাজারের এই মূল্যবৃদ্ধিকে সাময়িক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার মতে, এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা এবং সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, বাজারে তথাকথিত ‘নিরাপত্তা প্রিমিয়াম’ তত বাড়তে পারে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের জ্যেষ্ঠ ক্লাইমেট অ্যান্ড কমোডিটিস অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইনও তেল পরিবহন নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তার মতে, তেলবাহী জাহাজে হামলার কারণে ওমান উপসাগরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের কার্যক্রম কমে গেলে বাজারে সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে।

এ ধরনের স্থানান্তর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ সচল রাখা এবং দাম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

বিশ্ববাজারে বড় সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও গায়ানার মতো নন-ওপেক তেল উৎপাদক দেশগুলো উৎপাদন কিছুটা বাড়ালেও বাজারের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটছে না।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) গত মাসে সতর্ক করে জানিয়েছে, চলতি বছরে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ প্রতিদিন প্রায় ৪৩ লাখ ব্যারেল বা প্রায় ৪ শতাংশ কমে যেতে পারে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলোতে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version