আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার সময় হাতকড়া, মাথায় হেলমেট এবং শরীরে ভেস্ট পরানোর ব্যবস্থা থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। এ সময় নিজের প্রতি বিশেষভাবে কঠোর আচরণ করা হচ্ছে দাবি করে তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারকদের উদ্দেশে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন জিয়াউল আহসান। বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এদিন মামলার দশম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আব্বাস মল্লিক।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত বিভিন্ন গুম ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসান একমাত্র আসামি হিসেবে বিচারাধীন রয়েছেন।

ভাই হত্যার অভিযোগ

ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক তার ভাই আলকাছ মল্লিককে হত্যার জন্য জিয়াউল আহসানকে দায়ী করেন। পাশাপাশি গুম ও হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান তিনি।

সাক্ষ্য শেষ হওয়ার পর জিয়াউল আহসানের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান ও সাহিদুর রহমান সাক্ষীকে জেরা করেন। জেরা শেষ হলে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৮ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।

হাতকড়া ও হেলমেট নিয়ে জিয়াউলের বক্তব্য

সাক্ষ্যগ্রহণের একপর্যায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলার অনুমতি চান জিয়াউল আহসান। অনুমতি পাওয়ার পর তিনি জানান, সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনকালে প্রশিক্ষণের সময় কোমর ও ঘাড়ে ব্যথাজনিত সমস্যায় পড়েছিলেন।

তিনি বলেন, কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনার সময় বর্তমানে তার হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট এবং শরীরে ভেস্ট বা জ্যাকেট পরানো হচ্ছে। শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করে এসব ব্যবস্থা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।

নিজের বক্তব্যে জিয়াউল আহসান আরও বলেন, তার মনে হচ্ছে তিনি সবার টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। তাই ট্রাইব্যুনালের কাছে তিনি সুবিচার প্রত্যাশা করেন।

নিরাপত্তার কারণ দেখাল প্রসিকিউশন

জিয়াউলের বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে প্রসিকিউশনের মতামত জানতে চান ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম জানান, কারাগার থেকে আসামিকে কীভাবে আনা হবে, সেটি মূলত জেল কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার।

তবে নিরাপত্তার স্বার্থেই জিয়াউল আহসানকে হাতকড়া, হেলমেট ও ভেস্ট পরিয়ে আনা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণে কোনো ধরনের আইনগত ব্যত্যয় থাকলে আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন বলেও জানান প্রসিকিউটর।

‘পাঁচ গজ দূরত্বেও ঝুঁকি থাকতে পারে’

জিয়াউল আহসানের বক্তব্যের পর ট্রাইব্যুনাল জানায়, প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এর জবাবে জিয়াউল বলেন, প্রিজনভ্যান থেকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানা পর্যন্ত দূরত্ব খুবই কম—মাত্র কয়েক গজ। গাড়ি থেকে নামানোর সময়ও প্রায় ২০ জন পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকেন।

তখন ট্রাইব্যুনাল মন্তব্য করে, দূরত্ব এক গজ হলেও দূর থেকে হামলার ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জিয়াউল আহসান অবশ্য বলেন, ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বেশি এবং সেখানে সহজে কাউকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব নয়।

তিনি আবারও হাতকড়া ও ভেস্ট পরানোর ব্যবস্থা থেকে অব্যাহতির দাবি জানান।

আবেদনের পরামর্শ বিচারকের

জিয়াউল আহসানের অনুরোধের পর বিচারক মোহিতুল হক তাকে হাতকড়া ও ভেস্ট থেকে অব্যাহতি চেয়ে লিখিত আবেদন করার পরামর্শ দেন।

পরে জিয়াউল আহসানের আইনজীবী নাজনীন নাহার গণমাধ্যমকে জানান, তারা এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করবেন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রসিকিউশনের অবস্থান কী হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version