জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ওয়াকআউট এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিচিত একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি। কোনো সিদ্ধান্ত, বক্তব্য বা সংসদ পরিচালনার পদ্ধতির প্রতিবাদে কোনো দল বা সংসদ সদস্য অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলে সেটিকে ওয়াকআউট বলা হয়।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে দেশের প্রথম জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের অস্তিত্বই ছিল খুব সীমিত। সেই সংসদেই একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রথমবারের মতো ওয়াকআউট করেছিলেন। আর তার কারণ ছিল সংসদে নিজের বক্তব্য রাখার সুযোগ না পাওয়া।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদ
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটি গণপরিষদ গঠিত হয়। এর সদস্য সংখ্যা ছিল ৪৬৯। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ থেকে নির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই গণপরিষদ পরবর্তী সময়ে অস্থায়ী সংসদের ভূমিকা পালন করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ৩০০ আসনের মধ্যে দলটির প্রার্থীরা ২৯৩টি আসনে জয় পান। বাকি আসনগুলোর মধ্যে জাসদ ও বাংলাদেশ জাতীয় লীগ একটি করে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পাঁচটি আসনে জয়ী হন।
তবে নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল তৎকালীন কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল প্রথম সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সেখানে প্রচলিত অর্থে শক্তিশালী কোনো বিরোধী দল ছিল না। তখনকার সংসদ ভবনের নির্মাণকাজও সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে অধিবেশন বসত তেজগাঁওয়ের পুরোনো সংসদ ভবনে, যে ভবনটি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রথম ওয়াকআউটের ঘটনা
সংসদীয় নথি ও তৎকালীন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রথম জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনেই প্রথম ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটে।
তারিখ ছিল ১৯৭৪ সালের ২১ জানুয়ারি। ওই দিন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মো. আবদুল্যা সরকার সংসদে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার বক্তব্য গ্রহণ করা হয়নি। প্রতিবাদ হিসেবে তিনি একাই অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
আবদুল্যা সরকার ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কেন ওয়াকআউট করেছিলেন আবদুল্যা সরকার?
ঘটনার আগের দিন, অর্থাৎ ২০ জানুয়ারি ঢাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি জাসদ ‘গণ প্রতিরোধ দিবস’ পালন করে এবং হরতালের কর্মসূচি দেয়।
কর্তৃপক্ষ ওই সময় ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছিল। কিন্তু কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও সমাবেশের চেষ্টা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। রক্ষীবাহিনী, বিডিআর ও পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যাপক লাঠিচার্জ এবং অন্যান্যভাবে দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে।
তৎকালীন সংবাদপত্রগুলোর প্রতিবেদনে ওই দিনের ঘটনায় গ্রেপ্তার ও আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
এই ঘটনার পরদিন সংসদে বিষয়টি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন আবদুল্যা সরকার। তিনি ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’-এর মাধ্যমে আগের দিনের ঘটনাবলি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন।
কিন্তু তৎকালীন আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর তার বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিষয়টি আদৌ ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ কি না।
এরপর আবদুল্যা সরকার অভিযোগ করেন, জনগণের ওপর রক্ষীবাহিনীর কথিত নির্যাতনের বিষয়ে তাকে সংসদে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এর প্রতিবাদে তিনি ওয়াকআউটের ঘোষণা দিয়ে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
সংবাদপত্রেও উঠে আসে প্রথম ওয়াকআউটের খবর
পরদিন প্রকাশিত তৎকালীন সংবাদপত্রগুলোতে ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বিরোধী মতের সদস্যদের নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার পর্যাপ্ত সুযোগ না দেওয়ার প্রতিবাদেই স্বতন্ত্র সদস্য আবদুল্যা সরকার অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান।
অন্য একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তিনি একাই ওয়াকআউট করেছিলেন। যে বিষয়টি নিয়ে তিনি কথা বলতে চেয়েছিলেন, সেটি নিয়ে জাসদের সদস্য সাত্তারও সংসদে একটি মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ দিয়েছিলেন। তবে তিনি আবদুল্যা সরকারের সঙ্গে ওয়াকআউটে অংশ নেননি।
সেদিন সংসদের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার মোহাম্মদ বয়তুল্লাহ। মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ গ্রহণ না হওয়ার পর আবদুল্যা সরকার বিষয়টির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং রক্ষীবাহিনীকে ঘিরে আগের দিনের ঘটনা সংসদে আলোচনার দাবি জানান। কিন্তু কথা বলার সুযোগ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি ওয়াকআউট করেন।
পরে কী হয়েছিল আবদুল্যা সরকারের?
পরবর্তী সময়ে আবদুল্যা সরকার জাসদের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে তিনি দলটিতে যোগ দেন।
১৯৭৫ সালে বাকশাল বা বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগে যোগদানের প্রশ্নে তিনি সম্মতি না দেওয়ায় তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়। ওই সময় তার আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তী জীবনে তিনি বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৩ সালে মৃত্যুর আগে তিনি বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল—বাসদের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদীয় ইতিহাসে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনা?
আজকের বাংলাদেশে ওয়াকআউট রাজনৈতিক প্রতিবাদের পরিচিত কৌশল। কিন্তু স্বাধীনতার পর প্রথম সংসদে এর সূচনা হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায়।
তখন সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল ছিল না। তারপরও একজন স্বতন্ত্র সদস্য নিজের বক্তব্য দেওয়ার অধিকার এবং সংসদে একটি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘটনা তুলে ধরার সুযোগ না পাওয়ার প্রতিবাদে অধিবেশন ত্যাগ করেছিলেন।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথম ওয়াকআউট ছিল মূলত বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না পাওয়া এবং একটি রাজনৈতিক ঘটনার প্রতিবাদে একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের প্রতীকী প্রতিবাদ।
সেই ঘটনার প্রায় পাঁচ দশক পরও সংসদে ওয়াকআউট রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি হিসেবে টিকে আছে। সময় বদলেছে, সংসদের কাঠামো ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান বদলেছে, কিন্তু সংসদের ভেতরে মতপ্রকাশের অধিকার এবং বিরোধী মতের জায়গা নিয়ে বিতর্ক এখনো রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
