ভারতে লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি. জোসেফ বিজয়, যিনি ‘থালাপতি বিজয়’ নামেও পরিচিত।
বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট মোদিকে পাঠানো চিঠিতে তিনি লোকসভার মোট আসনসংখ্যা ৫৪৩-এ স্থায়ীভাবে রাখার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতিটি রাজ্যে বর্তমানে যতটি লোকসভা আসন রয়েছে, ভবিষ্যতের সীমানা পুনর্বিন্যাসের পরও সেই সংখ্যা অপরিবর্তিত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিজয়ের তৃতীয় দাবি হলো, আগামী লোকসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।
মোদিকে পাঠানো চিঠির সঙ্গে তামিলনাড়ু বিধানসভায় বুধবার পাস হওয়া একটি প্রস্তাবও যুক্ত করা হয়েছে। ওই প্রস্তাবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে লোকসভা আসন পুনর্নির্ধারণের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
দক্ষিণের রাজ্যগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা
তামিলনাড়ু বিধানসভার যুক্তি হলো, নতুন জনগণনার তথ্যের ভিত্তিতে লোকসভা আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হলে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো রাজনৈতিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে যেসব রাজ্য দীর্ঘ সময় ধরে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখিয়েছে, তাদের লোকসভা আসন কমে গেলে সেটিকে অন্যায্য ফলাফল হিসেবে দেখছে তামিলনাড়ু সরকার।
বিজয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে লোকসভার মোট সদস্যসংখ্যা ৫৪৩-ই রাখা উচিত। পাশাপাশি প্রতিটি রাজ্যের বিদ্যমান আসনসংখ্যাও ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধনের বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারকে বিবেচনা করতে হবে।
কেন আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে এত বিতর্ক?
ভারতে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। দক্ষিণের রাজ্যগুলোর আশঙ্কা, নতুন জনসংখ্যার হিসাবকে ভিত্তি করা হলে উত্তর ভারতের তুলনামূলক বেশি জনসংখ্যার রাজ্যগুলোর লোকসভা আসন বাড়তে পারে। বিপরীতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল দক্ষিণের রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্বের অনুপাত কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তামিলনাড়ু বিধানসভায় এ প্রসঙ্গে রাজ্যের অতীত ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আগের সীমানা পুনর্বিন্যাসের সময় ১৯৬৭ সালে তামিলনাড়ুর লোকসভা আসন ৪১ থেকে কমে ৩৯ হয়েছিল।
রাজ্যটির বর্তমান অবস্থান হলো, ১৯৭১ সালের পর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যেসব রাজ্য উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে দেওয়া হলে তা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সাফল্যের জন্য নেতিবাচক বার্তা তৈরি করতে পারে।
তামিলনাড়ু সরকারের দাবি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে যারা এগিয়ে গেছে, আসন পুনর্বিন্যাসের কারণে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়া উচিত নয়।
নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের দাবি
লোকসভা আসনের হিসাবের পাশাপাশি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও মোদির কাছে তুলে ধরেছেন বিজয়।
তিনি আগামী লোকসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচন থেকেই নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
এ জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ লোকসভায় আসনসংখ্যা ৫৪৩ রাখা, রাজ্যভিত্তিক বর্তমান আসন বণ্টন বহাল রাখা এবং নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা—এই তিন দাবিকেই সামনে রেখে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অবস্থান তুলে ধরেছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী।
এখন দেখার বিষয়, লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর এই উদ্বেগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কী ধরনের অবস্থান নেয় এবং বিজয়ের প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক আলোচনায় কতটা প্রভাব ফেলে।

