যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের প্রভাবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, টানা ২২ দিন ধরে দ্বীপটির তিনটি বড় টার্মিনালে নতুন কোনো তেল বা গ্যাসের চালান পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সময়ে সেখান থেকেও নতুন করে তেল রপ্তানির চালান বের হওয়ার ঘটনা দেখা যায়নি।

পারস্য উপসাগরে ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ দেশটির জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র কয়েক বর্গমাইল আয়তনের এই দ্বীপের টার্মিনালগুলো দিয়েই ইরানের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরল জ্বালানি বিদেশে পাঠানো হয়। ফলে এখানকার কার্যক্রম ব্যাহত হলে সরাসরি দেশটির তেল রপ্তানিতে প্রভাব পড়ে।

ইরান বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি রপ্তানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা ইরানি তেলের বড় অংশই চীনের বাজারে যায়। ফলে খার্গ দ্বীপের রপ্তানি কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে ইরানের বৈদেশিক আয়েও চাপ বাড়তে পারে।

খার্গ দ্বীপ মূলত ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। দেশের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র থেকে উত্তোলন করা অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে এখানে আনা হয়। পরে বড় ট্যাংকারে করে এসব তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলো ঘিরে চলমান বিধিনিষেধের কারণে দেশটির জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণে, গত ২২ দিনের মধ্যে খার্গ দ্বীপের তিনটি প্রধান টার্মিনালের কোনোটিতেই নতুন চালান পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া যায়নি।

এমনকি ৩১ জুলাইয়ের পর খার্গ দ্বীপ থেকে নতুন কোনো তেল রপ্তানি চালান বের হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি। বর্তমানে দ্বীপটির বন্দরে বেশ কয়েকটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার অবস্থান করছে বলে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণের তথ্য থেকে জানা গেছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এর আগে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলো ঘিরেও যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক চাপ বাড়ে। পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিস্থিতিতে সাময়িক কিছুটা স্বস্তি আসে। ওই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর চাপও কিছুটা কমেছিল।

তবে পরবর্তী সময়ে সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর আবারও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরও জোরদার করে।

অবরোধ শুরুর পর প্রথম দিকে ইরান কিছুটা সীমিত পরিসরে তেল পরিবহন চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও সে সময় নৌ অবরোধ এড়িয়ে তেল রপ্তানি চালু রাখাকে সরকারের সক্ষমতা হিসেবে তুলে ধরে।

কিন্তু পরিস্থিতি ধীরে ধীরে কঠিন হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের কোনো বন্দর থেকে খার্গ দ্বীপের দিকে নতুন তেলবাহী জাহাজ যাওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দেশের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র থেকে খার্গ দ্বীপের টার্মিনালে নতুন করে জ্বালানি পৌঁছানোর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইরানের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্রটির ওপর। দীর্ঘ সময় ধরে নতুন চালান না পৌঁছালে টার্মিনালগুলোর মজুত ও রপ্তানি সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেলের সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

খার্গ দ্বীপের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়। এটি ইরানের তেল রপ্তানি, বৈদেশিক আয় এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দেশটির অবস্থানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হয়, এখন সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version