মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্ক সফর ঘিরে সামনে এসেছে এক চমকপ্রদ ঘটনা। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, আঙ্কারা থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরার সময় ট্রাম্প যে বিমানে উঠেছেন বলে সবাইকে জানানো হয়েছিল, বাস্তবে তিনি সেটিতে পুরো যাত্রা করেননি। নিরাপত্তাজনিত কারণে মাঝপথে গোপনে বিমান পরিবর্তন করা হয়েছিল বলে পরে জানা যায়।

ঘটনাটি ঘটে জুলাইয়ের শুরুতে। ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নিতে তুরস্কে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেখানে যাওয়ার সময় তিনি কাতারের রাজপরিবারের দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-এ চড়েছিলেন। কিন্তু ফেরার সময় বিমানবন্দরে দেখা যায়, পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানই প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যভাবেই সেই বিমানে ওঠেন এবং বিদায় জানানোর দৃশ্যও সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়।

কিন্তু এর আড়ালে ছিল অন্য পরিকল্পনা।

বিমানে সাংবাদিক, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা ও কর্মীদের ওঠার পর ট্রাম্প অন্য একটি পথ দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। পরে বিমানবন্দরের একটি সাধারণ সরবরাহকারী গাড়িতে করে তাকে রানওয়ের অন্য প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অপেক্ষা করছিল মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি C-32A বিমান। সেই বিমানেই ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স মিল্ডেনহল ঘাঁটিতে পৌঁছান।

কিছুক্ষণ পর পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানও সেখানে পৌঁছে যায়। এরপর ট্রাম্প আবার গোপনে সেই বিমানে ওঠেন এবং পরবর্তীতে প্রকাশ্যে নেমে আসেন। ফলে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, তিনি পুরো পথ এয়ারফোর্স ওয়ানেই ভ্রমণ করেছেন।

পরে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট এই গোপন বিমান পরিবর্তনের বিষয়টি প্রকাশ করে। এরপর ট্রাম্প জানান, নিরাপত্তার কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং সিক্রেট সার্ভিসের পরামর্শেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

নিরাপত্তার স্বার্থে প্রেসিডেন্টের যাতায়াতের পরিকল্পনা গোপন রাখা নতুন কিছু নয়। অতীতেও মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বিবেচনায় বিমান পরিবর্তনের নজির রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের পাকিস্তান সফরের সময়ও নিরাপত্তা আশঙ্কায় নির্ধারিত বিমানের পরিবর্তে অন্য একটি বিমান ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছিল।

তবে ট্রাম্পের ঘটনাকে ঘিরে বিতর্কের মূল জায়গা অন্যত্র। প্রশ্ন উঠেছে, নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে কেন বিমানে থাকা সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কর্মীদের বিষয়টি জানানো হলো না?

কারণ ট্রাম্প যে বিমানে উঠেছিলেন বলে প্রকাশ্যে দেখানো হয়েছিল, সেই বিমানে তার সফরসঙ্গী সাংবাদিক ও কর্মকর্তারা ছিলেন। প্রেসিডেন্টকে বিকল্প বিমানে সরিয়ে নেওয়ার পরও তারা আগের বিমানেই যাত্রা করেন। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি যদি সত্যিই গুরুতর হয়ে থাকে, তাহলে তাদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো আলোচনায় রয়েছে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কেন বিষয়টি এতদিন প্রকাশ করেননি?

যুক্তরাজ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা হুমকির কথা অস্বীকার করেছিলেন। তিনি বলেন, তার ওপর সবসময়ই হুমকি থাকে। কিন্তু তখন তিনি যে গোপনে অন্য একটি সামরিক বিমানে করে তুরস্ক ছাড়েছিলেন, সে তথ্য প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়নি।

এ কারণেই সমালোচকদের অভিযোগ, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি নেই, কিন্তু ঝুঁকি কেটে যাওয়ার পরও পুরো বিষয়টি গোপন রাখা এবং প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাওয়া স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সাবেক মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও জানতে চাইছেন, পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের জন্য কী ধরনের অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কারণ প্রেসিডেন্টকে এক বিমান থেকে সরিয়ে নেওয়া হলেও অন্য বিমানটি একই রুটে যাত্রা করেছে।

কংগ্রেসকেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো গুরুতর হুমকি থাকলে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বকে অন্তত হুমকির মাত্রা সম্পর্কে অবহিত করা উচিত ছিল কি না, সেই বিতর্কও শুরু হয়েছে।

ঘটনাটি ইরানকে ঘিরে মার্কিন প্রশাসনের আগের বক্তব্যগুলোকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা এর আগে বহুবার ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে খাটো করে বক্তব্য দিয়েছেন। ট্রাম্প এমন কথাও বলেছেন যে মার্কিন বিমান ইরানের আকাশসীমায় কার্যত বাধাহীনভাবে চলাচল করছে।

কিন্তু আঙ্কারা থেকে গোপনে বিমান পরিবর্তনের ঘটনা সত্য হলে অন্তত এটুকু বোঝা যায়, মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ইরান-সম্পর্কিত সম্ভাব্য ঝুঁকিকে একেবারে উপেক্ষা করেনি। বরং প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য অস্বাভাবিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান নিয়ে আগের বিতর্কও। কাতারের দেওয়া নতুন বিমানটি নিয়ে শুরু থেকেই নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। ট্রাম্প অবশ্য এসব অভিযোগকে গুরুত্ব দেননি। বরং নতুন বিমানটি দ্রুত ব্যবহারের আগ্রহও তার মধ্যে দেখা গেছে।

পরে বিমানটি সংস্কার বা প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের জন্য পাঠানো হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন ওঠে—বিমানটির নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নিয়ে আগে যেসব উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল, সেগুলো কি আসলেই ভিত্তিহীন ছিল?

এই জায়গাতেই পুরো ঘটনাটি আরও রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। কারণ কোনো একটি বিমান পরিবর্তনের ঘটনা হয়তো নিরাপত্তার স্বাভাবিক কৌশল হিসেবেই দেখা যেত। কিন্তু একই সঙ্গে যদি নতুন বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, পুরোনো বিমানে থাকা সাংবাদিকদের কিছু না জানানো হয় এবং প্রেসিডেন্ট পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে অস্বীকার করেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একাধিক প্রশ্ন তৈরি হয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই এখন—ট্রাম্প কি শুধু নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিষয়টি গোপন করেছিলেন, নাকি ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে নিজের আগের বক্তব্যের সঙ্গে এই ঘটনার সংঘাত প্রকাশ্যে আসুক, সেটি তিনি চাননি?

নিরাপত্তা সংস্থার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কি না, সেটি এক বিষয়। কিন্তু প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া একটি গোপন সিদ্ধান্ত পরে কীভাবে জনগণ, সাংবাদিক ও কংগ্রেসের কাছে ব্যাখ্যা করা হবে—সেটিই এখন বড় রাজনৈতিক বিতর্ক।

আর সেই কারণেই ট্রাম্পের তুরস্ক থেকে ফেরার এই বিমান বদলের ঘটনা শুধু একটি নিরাপত্তা কৌশল নয়; এটি হয়ে উঠেছে তথ্য গোপন, প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version