ভারতে পাকিস্তানি শিল্পীদের কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে বলিউডে নতুন কোনো গান নিয়ে হাজির হতে পারেননি পাকিস্তানের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আতিফ আসলাম। তবে পেশাগতভাবে দূরে থাকলেও ভারতীয় শ্রোতাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক যে এখনো অটুট, সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেটিই জানিয়েছেন এই গায়ক।
ক্রিস ফেডের সঙ্গে আলাপকালে আতিফ বলেন, ভারতে তার গান শোনার আগ্রহ এখনো রয়েছে ভক্তদের মধ্যে। নানা প্রযুক্তিগত উপায়ে তারা তার পুরোনো গান শুনছেন। এমনকি কেউ কেউ গান সংরক্ষণ করে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
আতিফের ভারতীয় ক্যারিয়ারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ২০১৬ সালের পর। সে সময় দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানি শিল্পীদের ভারতে কাজ করার সুযোগ সংকুচিত হতে থাকে। গুরগাঁওয়ে আতিফের একটি কনসার্টও বাতিল করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রাঙ্গনে পাকিস্তানি শিল্পীদের কাজের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। এরপর থেকে ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংগীতজগতে আতিফের নতুন কাজের সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
তবে আতিফের ভাষায়, নিষেধাজ্ঞা তার ভারতীয় ভক্তদের ভালোবাসা থামাতে পারেনি। তিনি জানান, অনেক শ্রোতা ভিপিএনের মাধ্যমে তার গান শুনছেন। কেউ কেউ পুরোনো গান সংগ্রহ করে অন্যদেরও দিচ্ছেন। যদিও পাইরেসিকে সমর্থন করেন না তিনি, তবু সংগীতের নিজস্ব একটা পথ আছে বলেই মনে করেন এই শিল্পী।
নিজের শুরুর সময়ের কথাও স্মরণ করেছেন আতিফ। তখন তার গান রেডিও, ক্যাসেট, সিডি কিংবা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের কিছুটা মিল খুঁজে পান তিনি।
ভারতের শ্রোতাদের উদ্দেশে আতিফের বার্তাও ছিল আবেগপূর্ণ। তার বক্তব্য, তিনি ভারতে কাজ করার সুযোগকে যতটা না মিস করেন, তার চেয়ে বেশি মিস করেন সেখানকার শ্রোতাদের। ভক্তদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, তারা যদি তার গান ভালোবাসেন, তাহলে কোনো না কোনোভাবে সেই গান তাদের কাছে পৌঁছাবেই।
ভারতে কাজ করতে না পারাকে অবশ্য পুরোপুরি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন না আতিফ। তার মতে, বলিউডে প্লেব্যাকের মাধ্যমে তিনি অনেক কিছু শিখেছেন। কিন্তু সেই কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নিজের সংগীত নিয়ে আরও গভীরভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। এমনকি যারা তাকে ভারতে কাজ করতে বাধা দিয়েছেন, তাদের প্রতিও এক অর্থে কৃতজ্ঞ তিনি—কারণ পরিস্থিতিটি তাকে নিজের শিল্পীসত্তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছে।
ভারতীয় শ্রোতাদের সঙ্গে আতিফের সম্পর্ক অবশ্য বলিউডে তার অভিষেকেরও আগে। পাকিস্তানি ব্যান্ড ‘জাল’-এর সঙ্গে থাকা অবস্থায় ‘আদাত’ গানটি তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। পরে ২০০৪ সালে নিজের প্রথম একক অ্যালবাম ‘জল পরী’-তেও গানটির নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেন তিনি।
২০০৫ সালে ‘জেহের’ সিনেমার ‘ওহ লামহে’ গান দিয়ে বলিউডে প্লেব্যাকের যাত্রা শুরু হয় আতিফের। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় গান তাকে ভারতীয় সংগীতপ্রেমীদের কাছে পরিচিত করে তোলে। ‘পেহলি নাজার মে’, ‘তু জানে না’, ‘তেরে হোনে লাগা হুঁ’, ‘জিনা জিনা’ এবং ‘দিল দিয়া গাল্লাঁ’সহ বহু গান এখনো শ্রোতাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে।
বলিউডের পাশাপাশি পাকিস্তানের সংগীতাঙ্গনেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন আতিফ। ‘দুরি’ ও ‘মেরি কাহানি’র মতো অ্যালবাম তাকে আরও জনপ্রিয় করে। সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও দেখা গেছে তাকে। ২০১১ সালে ‘বোল’ সিনেমার মাধ্যমে বড়পর্দায় অভিষেক করেন তিনি।
২০০৮ সালে পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক সম্মাননা ‘তমঘা-ই-ইমতিয়াজ’ অর্জন করেন আতিফ আসলাম। দীর্ঘদিন ভারতে নতুন গান প্রকাশের সুযোগ না থাকলেও তার পুরোনো গান ও ভারতীয় শ্রোতাদের ভালোবাসা প্রমাণ করছে—রাজনৈতিক সীমারেখা কিংবা নিষেধাজ্ঞা সবসময় একজন শিল্পী ও তার শ্রোতার সম্পর্ককে থামিয়ে দিতে পারে না।
