মহাকাশপ্রেমীদের জন্য আসছে এক অসাধারণ মুহূর্ত। আগামী ১২ আগস্ট পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দেখা যাবে বিরল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। ২০২৪ সালের এপ্রিলের পর এটিই হবে বিশ্বের প্রথম পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। একই সঙ্গে ১৯৯৯ সালের পর ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে এটি হবে প্রথম দৃশ্যমান পূর্ণ সূর্যগ্রহণ।

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণগ্রাসের সর্বোচ্চ স্থায়িত্ব হতে পারে প্রায় ২ মিনিট ১৮ সেকেন্ড। গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী বুধবার ১২ আগস্ট বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিটের দিকে সূর্যগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চাঁদের ছায়া দ্রুত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে অগ্রসর হবে।

পূর্ণগ্রাসের ছায়াপথ শুরু হবে আর্কটিক অঞ্চল থেকে। এরপর এটি পশ্চিম আইসল্যান্ডের ওপর দিয়ে এগিয়ে উত্তর-পূর্ব পর্তুগাল এবং উত্তর স্পেনের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাবে।

স্পেনে এই দৃশ্য দেখার সুযোগ থাকবে বেশ কয়েকটি শহর থেকে। লিওন, বুর্গোস, ভায়াদোলিদ, সানতান্দের, বিলবাও, জারাগোজা, ভ্যালেন্সিয়া ও পালমা—এসব অঞ্চল পূর্ণগ্রাসের পথের মধ্যে থাকায় সেখানে দৃশ্যটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্পেনের স্থানীয় সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা সাড়ে ৮টার দিকে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে পূর্ণগ্রাস শুরু হতে পারে। অবস্থান অনুযায়ী সেখানে সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ সেকেন্ড পর্যন্ত সূর্য পুরোপুরি চাঁদের আড়ালে চলে যেতে পারে।

তবে মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা পূর্ণগ্রাসের সরাসরি পথের বাইরে থাকবে। তারপরও এসব শহর থেকে সূর্যের ৯৯ শতাংশেরও বেশি অংশ চাঁদের আড়ালে চলে যেতে দেখা যেতে পারে।

শুধু ইউরোপ নয়, পৃথিবীর আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে এই গ্রহণের আংশিক দৃশ্য দেখা যাবে। অনুমান করা হচ্ছে, প্রায় দেড় কোটি মানুষ পূর্ণগ্রাসের সরাসরি পথের মধ্যে অবস্থান করবেন। তাদের বড় একটি অংশই স্পেনের বাসিন্দা।

অন্যদিকে আংশিক কিংবা পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পেতে পারেন বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯৮ কোটি মানুষ। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতি আটজন মানুষের মধ্যে একজনেরও বেশি কোনো না কোনোভাবে এই মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী হতে পারেন।

কিন্তু সূর্যগ্রহণ আসলে কীভাবে ঘটে?

চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে চলে আসে এবং সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছানোর পথে বাধা সৃষ্টি করে, তখন সূর্যগ্রহণ ঘটে। চাঁদ যদি সূর্যের পুরো চাকতিকে আড়াল করে ফেলে, তখন সেটিকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ বলা হয়।

এখানে রয়েছে মহাকাশের একটি চমকপ্রদ কাকতালীয় বিষয়। সূর্যের ব্যাস চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বড়। কিন্তু একই সঙ্গে সূর্য পৃথিবী থেকে চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বেশি দূরে অবস্থান করছে। ফলে পৃথিবী থেকে দেখলে আকাশে সূর্য ও চাঁদকে প্রায় একই আকারের মনে হয়। আর এ কারণেই কখনো কখনো চাঁদ পুরো সূর্যকে ঢেকে ফেলতে পারে।

নাসার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর পৃথিবীতে সাধারণত দুই থেকে পাঁচটি সূর্যগ্রহণ ঘটে। এগুলোর মধ্যে থাকতে পারে আংশিক, বলয়গ্রাস, পূর্ণগ্রাস কিংবা সংকর সূর্যগ্রহণ।

তবে সব ধরনের গ্রহণের মধ্যে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বিরল। দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি শতকে গড়ে প্রায় ৬৬টি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটে। মোট সূর্যগ্রহণের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আংশিক, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বলয়গ্রাস, এক-চতুর্থাংশের কিছু বেশি পূর্ণগ্রাস এবং মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ সংকর ধরনের।

তাই ১২ আগস্টের এই মহাজাগতিক ঘটনা শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও হতে যাচ্ছে বিশেষ আকর্ষণের। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কোটি কোটি মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করবেন—চাঁদের ছায়ায় কয়েক মুহূর্তের জন্য সূর্য হারিয়ে যাওয়ার সেই বিরল দৃশ্য দেখার জন্য।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version